দিনাজপুরে সাঁওতালদের ঐতিহ্যবাহী ‘বউমেলা’ এখন মিলনমেলা: জীবনসঙ্গী খোঁজার প্রথা হারিয়ে গেছে সময়ের স্রোতে
দিনাজপুরের বীরগঞ্জে সাঁওতাল আদিবাসীদের যুগ যুগ ধরে চলে আসা ঐতিহ্যবাহী মেলা এবারও বসেছে। কোনো প্রচার-প্রচারণা ছাড়াই প্রতি বছর শারদীয় দুর্গাপূজার বিজয়া দশমীর পরের দিন বাসিয়া হাটিতে এই মেলা অনুষ্ঠিত হয়। একসময় এই মেলার প্রধান আকর্ষণ ছিল জীবনসঙ্গী খুঁজে নেওয়া, আর সে কারণেই দীর্ঘদিন ধরে এটি ‘বউমেলা’ নামে পরিচিত। তবে সময়ের বিবর্তনে এখন আর সেই প্রথা নেই; মেলাটি রূপ নিয়েছে মিলনমেলায়।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) গোলাপগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আদিবাসী সমাজ উন্নয়ন সমিতির আয়োজনে এই মেলা বসে। সকাল থেকেই প্রচলিত রীতি অনুযায়ী রকমারি সাজে বাড়ির বড়দের সঙ্গে মেলায় আসেন সাঁওতাল তরুণ-তরুণীরা। ভিড় বাড়তে থাকলেও মূল মেলা জমে ওঠে বিকেল ৩টার পর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত, আর তাতে হাজার হাজার মানুষের সমাগম ঘটে।
নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন বীরগঞ্জ থানা পুলিশের নেতৃত্বে আনসার ও গ্রামপুলিশ সদস্যরা। উৎসবের পরিবেশ শান্তিপূর্ণ রাখতে মেলা প্রাঙ্গণজুড়ে তাদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
সরেজমিনে দেখা যায়, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন বয়সী মানুষের পাশাপাশি হিন্দু, মুসলিমসহ বিভিন্ন ধর্ম ও বর্ণের মানুষের অংশগ্রহণে মেলা প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। ফলে মেলাটি এখন আর একটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি হয়ে উঠেছে এলাকার সব মানুষের মিলনক্ষেত্র।
কাচের চুড়ি, রঙিন ফিতা, লিপস্টিক, কানের দুল, ঝিনুকের মালা, মাটির খেলনা, দা, কুড়াল, হাঁড়ি-পাতিলসহ নানা পণ্য ও খাবারের দোকান নিয়ে দূরদূরান্ত থেকে আসা দোকানিরা বেচাকেনায় ব্যস্ত সময় পার করেন। মেলাকে ঘিরে তাই স্থানীয় অর্থনীতিতেও এক দিনের জন্য হলেও চাঙা ভাব দেখা দেয়।
বাজনার তালে তালে চলে ঐতিহ্যবাহী নাচ-গানের আসর। ফুলের সাজে ও রঙিন পোশাকে সেজে আসা সাঁওতাল তরুণীরা ছিলেন সবার নজর কাড়ার মতো, আর সেই সাজ-পোশাকেই ফুটে ওঠে জনগোষ্ঠীটির নিজস্ব সংস্কৃতির রং।
বিকেলে আয়োজক কমিটির সভাপতি জোসেফ হেমরমের সভাপতিত্বে আলোচনা সভা হয়। এতে বক্তব্য দেন বীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার সুমা খাতুন, দিনাজপুর জেলা বিএনপির উপদেষ্টা ও চেম্বার অফ কমার্সের পরিচালক রেজওয়ানুল ইসলাম রিজু, পৌর বিএনপির সভাপতি আলহাজ্ব মো. আমিরুল বাহার, আয়োজক কমিটির উপদেষ্টা ও নিজপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আনিসুর রহমান আনিস, মোহনপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহিনুর রহমান চৌধুরী শাহিন এবং বীরগঞ্জ উপজেলা আদিবাসী নেতা শীতল মার্ডী।
জোসেফ হেমরম বলেন, “কেউ বলে ২০০ বছরের বেশি, আবার কেউ বলে অনেক দিন ধরে এ মেলা চলছে। মেলাটি কবে শুরু হয়েছে, তা কেউ বলতে পারে না। একসময় জীবনসঙ্গী খোঁজার কারণে এর নাম বউমেলা হলেও আধুনিক যুগের প্রভাবে এখন আর সেই প্রথা এখানে নেই। তা এখন শুধু মিডিয়া ও ফেসবুকেই সীমাবদ্ধ।”
তিনি আরও বলেন, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সন্তানেরা শিক্ষিত হচ্ছে, তারা এখন সামাজিকভাবেই চলে। তাই দীর্ঘদিন ধরে বিজয়া দশমীর পরের দিন দূরদূরান্তের আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে মিলিত হয়ে আনন্দ ভাগাভাগি করা হয়, আর এভাবেই মেলাটি মিলনমেলার রূপ নিয়েছে।
আনিসুর রহমান আনিস বলেন, “আগে কঠিন সামাজিক বিধিবিধান থাকলেও এখন অনেকেই রাষ্ট্রীয় নিয়মনীতি মেনে বিয়ে করছেন। আগের মতো কোনো ঘটনাও এখন আর ঘটে না। মেলা উপলক্ষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও আনন্দ আয়োজন চলে, যা এখন মিলনমেলায় রূপান্তরিত হয়েছে।”
শীতল মার্ডী বলেন, “একসময় এ মেলার নাম ছিল বউমেলা, এখন এটি আদিবাসীদের মিলনমেলা নামে পরিচিত। পূর্বপুরুষেরা এ মেলা শুরু করেছিলেন, আমরা সেই ধারাবাহিকতা রক্ষা করে যাচ্ছি। কবে থেকে মেলার প্রচলন, তা সঠিকভাবে বলা যাবে না। বাপ-দাদার কাছে শুনেছি, যুগ যুগ ধরে এ মেলা আপনাআপনি চলছে। আমরা শুধু বাপ-দাদার পথ ধরে আনুষ্ঠানিকতা চালিয়ে যাচ্ছি।”
আয়োজকদের ভাষ্যে, মেলার নামের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা পুরোনো প্রথা হারিয়ে গেলেও এর সামাজিক গুরুত্ব কমেনি। বরং প্রতি বছর এই একটি দিনে দূরে থাকা আত্মীয়স্বজন একত্র হন, নতুন প্রজন্ম পরিচিত হয় নিজেদের ঐতিহ্যের সঙ্গে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রশাসন ও আয়োজকদের সহযোগিতায় এই ঐতিহ্য আগামী বছরগুলোতেও একইভাবে টিকে থাকবে। বিজয়া দশমীর পরের দিন বাসিয়া হাটিতে আবারও বসবে এই মিলনমেলা—সেই অপেক্ষাতেই বিদায় নেন এবারের দর্শনার্থীরা।






