রাশিয়ার পাঁচটি ডেটা সেন্টারে ইউক্রেনের ড্রোন হামলা: বিপর্যস্ত পেমেন্ট-ন্যাভিগেশন, ধাক্কা খেল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অগ্রগতি
ইউক্রেনের ড্রোন অক্টোবর মাসে রাশিয়ার সবচেয়ে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর পাঁচটি ডেটা সেন্টারে আঘাত হেনেছে। এতে দেশজুড়ে ক্লাউড সেবা, পেমেন্ট ব্যবস্থা ও ন্যাভিগেশন অ্যাপে টানা বিঘ্ন দেখা দিয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন।
ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনী ইয়ানডেক্সের তিনটি স্থাপনায় হামলা চালায়—রিয়াজান অঞ্চলের সাসোভোতে ৭ অক্টোবর, কালুগায় ৯ অক্টোবর এবং ভ্লাদিমিরে ১১ অক্টোবর।
এরপর ১৪ অক্টোবর সারাতোভ অঞ্চলের বালাকোভোতে স্বেরের একটি ডেটা সেন্টার এবং ১৮ অক্টোবর সেন্ট পিটার্সবার্গের কাছে লেনিনগ্রাদ অঞ্চলে ভিকন্টাক্টের একটি ডেটা সেন্টার হামলার শিকার হয়।
ইয়ানডেক্স, স্বের ও ভিকন্টাক্টে মিলে রাশিয়ার ভোক্তা ইন্টারনেট অবকাঠামোর বড় অংশ পরিচালনা করে—ট্যাক্সি অ্যাপ ও কার্ড পেমেন্ট প্রক্রিয়াকরণ থেকে শুরু করে ক্লাউড স্টোরেজ ও বার্তা আদান-প্রদান পর্যন্ত।
কোনো প্রতিষ্ঠানই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রকাশ করেনি। তবে রাশিয়ার বাসিন্দারা পণ্যের মূল্য পরিশোধ, ট্যাক্সি ডাকা, ন্যাভিগেশন ব্যবহার ও ক্লাউড স্টোরেজে প্রবেশে টানা সমস্যার কথা জানিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অবকাঠামো পুনরুদ্ধারে কয়েক মাস এমনকি কয়েক বছরও লেগে যেতে পারে। ইন্টারনেট প্রোটেকশন সোসাইটির প্রধান মিখাইল ক্লিমারেভ বার্তা সংস্থা এপিকে বলেছেন, হামলাগুলো রাশিয়ার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়নকে পিছিয়ে দিয়েছে।
এই হামলার পেছনে রয়েছে পাল্টাপাল্টি আক্রমণের প্রেক্ষাপট। রাশিয়া নিজেও এই শরতে ধারাবাহিকভাবে ইউক্রেনের ডেটা সেন্টারগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে।
১৯ অক্টোবর রাশিয়ার হামলায় কিয়েভে ইউক্রেনীয় অপারেটর ডেটাগ্রুপের অন্যতম বৃহত্তম স্থাপনা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায় এবং তা মেরামতের অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। পরদিন রাশিয়ার হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় কিয়েভের গিগাসেন্টার। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে আরও কয়েকটি ইউক্রেনীয় ডেটা সেন্টারে হামলা চালায় রাশিয়া।
এর আগে জুলাইয়ে রাশিয়ার একটি হামলা কিয়েভজুড়ে ইন্টারনেট, মোবাইল যোগাযোগ ও টেলিভিশন সম্প্রচার বিঘ্নিত করেছিল। পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের প্রথম দিন থেকেই মস্কো ইউক্রেনের তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে আসছে—২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে একটি সরকারি সার্ভার স্থাপনায় এবং ১ মার্চ মধ্য কিয়েভের ন্যাশনাল ডেটা ব্যাকআপ সেন্টারে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়।
ইউক্রেন এরপর থেকে তাদের বেশির ভাগ ডেটা ইউরোপীয় দেশগুলোর সার্ভারে সরিয়ে নিয়েছে, ফলে পরবর্তী হামলাগুলোর প্রভাব সীমিত থেকেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার ডেটা সেন্টারগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। তথাকথিত ‘সার্বভৌম ইন্টারনেট’ তৈরির আইনের কারণে রাশিয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সব ডেটা দেশের ভেতরের সার্ভারেই রাখতে হয়। এই কেন্দ্রীভবন স্থাপনাগুলোকে হামলার সহজ লক্ষ্যে পরিণত করেছে।
ইউরেশিয়া গ্রুপের জ্যেষ্ঠ জিও-টেকনোলজি বিশ্লেষক নিক রেইনার্স বলেন, ‘রাশিয়ার সমস্যা হলো তাকে বিশাল ভূখণ্ডজুড়ে বিমান প্রতিরক্ষা দিতে হয়, কিন্তু তার জন্য পর্যাপ্ত সম্পদ তার নেই। সব অবকাঠামো ও সব ডেটা দেশের ভেতরে থাকায় সেগুলো অকেজো করে দেওয়া তুলনামূলক সহজ।’
বিশ্লেষকরা এসব স্থাপনাকে ‘নরম লক্ষ্য’ হিসেবে বর্ণনা করেন—সার্ভার, বিদ্যুৎ সরঞ্জাম ও শীতলীকরণ ব্যবস্থায় ভরা বিশাল হলঘরে ছোট একটি বিস্ফোরকও বড় ক্ষতি করতে পারে। আঘাতপ্রাপ্ত ইয়ানডেক্স স্থাপনাগুলোর স্যাটেলাইট ছবিতে আগুনের চিহ্ন দেখা গেছে, যা মাইক্রোচিপসহ ভঙ্গুর যন্ত্রাংশ ধ্বংস করে থাকতে পারে।
ক্লিমারেভ এপিকে বলেন, ‘এমন হামলার পর কিছু টিকে থাকার আশা করা কঠিন। ডেটা সেন্টারের সরঞ্জাম ভঙ্গুর, যত্নসাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। আগুনের কালি ইলেকট্রনিকসের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।’
ইয়ানডেক্সের ক্ষতি রাশিয়ার এআই উচ্চাকাঙ্ক্ষার জন্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। প্রতিষ্ঠানটির তিনটি সুপারকম্পিউটার বিশ্বের শীর্ষ ৫০০-এর মধ্যে রয়েছে। সবচেয়ে শক্তিশালীটি সাসোভো স্থাপনায় অবস্থিত; একসময় বিশ্বে ১৯তম স্থানে থাকলেও এখন তা শীর্ষ ১০০-এর নিচে নেমে গেছে।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের কনর মার্টিন বলেন, ইউক্রেনের ড্রোন হামলা সম্ভবত রাশিয়ার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়নকে আরও পিছিয়ে দেবে। হামলার আগেই রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের চেয়ে কয়েক বছর পিছিয়ে ছিল।
হার্ডওয়্যার পুনরুদ্ধার আরও জটিল হবে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও বিশ্বব্যাপী চিপ সংকটের কারণে। ইয়ানডেক্সের সুপারকম্পিউটারগুলো এনভিডিয়ার এ১০০ প্রসেসরে চলে, যা রাশিয়া আইনত আমদানি করতে পারে না।
ক্লিমারেভের মতে, এই হামলার একটি অনিচ্ছাকৃত পরিণতিও থাকতে পারে। তিনি বলেন, ‘বিপরীতভাবে, ডেটা সেন্টারে হামলা রাশিয়ার ইন্টারনেটকে বিচ্ছিন্ন হওয়া থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে, কারণ প্রতিষ্ঠানগুলো এখন তাদের কম্পিউটিং সম্পদ সরিয়ে নিতে বাধ্য হবে, সম্ভবত ইউরোপে।’ তাঁর ধারণা, অনেক রুশ প্রতিষ্ঠান এখন ইউরোপের বাজারে কম্পিউটিং সক্ষমতা ভাড়া নেওয়ার সুযোগ খুঁজছে এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি সীমিত রাখতে কর্তৃপক্ষ ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ কঠোর করার চেষ্টা শিথিলও করতে পারে।
প্রসঙ্গত, মস্কো বহু বছর ধরে নিজের তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে ব্যবহারকারীদের ওপর নজরদারি এবং অন্য দেশে ক্ষতিকর হাইব্রিড কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে ব্যবহার করে আসছে। রাশিয়ার এসওআরএম আইনের অধীনে ইয়ানডেক্স, ভিকন্টাক্টে ও স্বেরসহ সব দেশীয় ইন্টারনেট প্রতিষ্ঠানকে এফএসবির জন্য ব্যাকডোর স্থাপন করতে হয়, যাতে নিরাপত্তা সংস্থাগুলো ব্যবহারকারীদের ডেটা ও যোগাযোগে প্রবেশাধিকার পায়।
ভিকন্টাক্টেকে বিশেষভাবে রাষ্ট্রীয় প্রচারণা ও নিয়োগের কাজে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে; ইউক্রেন ২০১৭ সালে আংশিকভাবে এ কারণেই প্ল্যাটফর্মটি নিষিদ্ধ করেছিল। ক্রেমলিন এআই টুল ব্যবহার করে বিকৃত তথ্য ছড়ানোর কাজেও এগিয়ে—আসল সংবাদ প্রতিবেদন ক্রেমলিনপন্থি ঢঙে পুনর্লিখন করে ভুয়া দাবিসহ ডজনখানেক ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে, যেগুলো বৈধ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের অনুকরণে তৈরি।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞা অনুযায়ী রুশ প্রতিষ্ঠানগুলোকে তথ্যপ্রযুক্তি সেবা, সফটওয়্যার ও ক্লাউড সক্ষমতা সরবরাহ নিষিদ্ধ। বিধিনিষেধ এড়াতে মধ্যস্থতাকারী, বেনামি হোস্টিং সরবরাহকারী বা বিদেশি করপোরেট কাঠামো ব্যবহারের ঘটনাও ঘটেছে, আর ব্রাসেলস এসব নিয়মের প্রয়োগ আরও কঠোর করছে।
সব মিলিয়ে, ডেটা সেন্টার এখন যুদ্ধের একটি নতুন ফ্রন্টে পরিণত হয়েছে, যেখানে সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরেও ডিজিটাল অবকাঠামোতে আঘাত হেনে প্রতিপক্ষের অর্থনীতি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতাকে দুর্বল করার প্রতিযোগিতা চলছে।




