সপ্তাহান্তে ফ্রান্সে দোকান-জাদুঘর বন্ধের প্রস্তুতি, দুই শহরে বিক্ষোভ নিষিদ্ধ
সারা দেশে বিক্ষোভ সহিংস রূপ নেওয়ার এক সপ্তাহ পর শৃঙ্খলা ফেরাতে মরিয়া ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সরকার। বিক্ষোভের ওপর বিধিনিষেধ থাকা সত্ত্বেও সপ্তাহান্তে বেশ কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও জাদুঘর বন্ধ রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে, যাতে নতুন করে অস্থিরতা ছড়ালে ক্ষয়ক্ষতি সীমিত রাখা যায়।
দেশটির প্রধান শিক্ষার্থী সংগঠন ইউনেফ শনিবার সমাবেশের ডাক দিয়েছে। এ ছাড়া ২০১৮ সালে উঠে আসা প্রতিষ্ঠানবিরোধী শক্তি ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলন এ সপ্তাহে মধ্য প্যারিসে মিছিলের পরিকল্পনা জানিয়েছে। শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের সঙ্গে তাদের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনায় শুক্রবার বসার কথা ছিল ম্যাক্রোঁর।
তবে ইউনেফ আগেভাগেই জানিয়ে দিয়েছে, তাদের সমাবেশ হবেই। ইমেইলে পাঠানো এক বিবৃতিতে সংগঠনটি বলেছে, ‘ম্যাক্রোঁ আমাদের দেশে বিক্ষোভের স্বাধীনতাকে পদদলিত করছেন এবং যে প্রজাতন্ত্রের মূল্যবোধ রক্ষার কথা তিনি বলছেন, তিনি তার গায়ে থুতু ছিটাচ্ছেন।’ গত মাসে শিক্ষকের ঘাটতি ও জীর্ণ সুযোগ-সুবিধার প্রতিবাদে হাইস্কুল শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ থেকেই এই আন্দোলন বড় আকার ধারণ করেছে।
ফ্রান্স এখনো গত সপ্তাহান্তের ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে পারেনি—সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ সহিংসতা দেখা গিয়েছিল তখন, সারা দেশের বিক্ষোভের পাশাপাশি চলেছিল লুটপাট ও দাঙ্গা। এরপর প্যারিস ও অন্যান্য শহরের কিছু অংশে রাতের কারফিউ জারির পর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়েছে এবং বড় কোনো ঘটনা ছাড়াই দিন কেটেছে।
ম্যাক্রোঁ সহিংসতার জন্য বিদ্রোহী কট্টর বামপন্থি গোষ্ঠীগুলোকে দায়ী করেছেন। প্রভাবশালী বামপন্থি দল ‘ফ্রান্স আনবাউড’ অবশ্য সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। বৃহস্পতিবার ম্যাক্রোঁ বলেছেন, আগামী দিনগুলোতে অবৈধ বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করা হবে। শ্রমিক ইউনিয়নের মতো গোষ্ঠীর আয়োজিত বিক্ষোভ চলতে দেওয়া হলেও সেগুলো বিকল্প পথে সরিয়ে দেওয়া হতে পারে।
সরকারের এই কঠোর অবস্থান নিয়ে ইতিমধ্যে সমালোচনা শুরু হয়েছে। দেশের অন্যতম বৃহৎ শ্রমিক সংগঠন সিএফডিটির সাধারণ সম্পাদক মারিলিজ লেওঁ বলেছেন, এ পদক্ষেপে শান্তি ফেরানোর সম্ভাবনা কম। ফরাসি সম্প্রচারমাধ্যম টিএফ১-কে তিনি বলেন, ‘এটি উল্টো ফল দেবে, কারণ অনেক ক্ষোভ আছে, প্রচুর ক্ষোভ—এবং বিবেচনায় নেওয়ার ও শোনার দাবি আছে।’ তাঁর মতে, মানুষের ক্ষোভ মোকাবিলায় সরকারের বরং সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেওয়া উচিত।
বিক্ষোভকারীদের দাবিগুলো মূলত অর্থনৈতিক। শ্রমিক, শিক্ষার্থী ও অন্যরা বাজেট কাটছাঁটের প্রতিবাদ করছেন এবং জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয় সামলাতে মানুষকে সহায়তা করতে বেশি মজুরির দাবি জানাচ্ছেন। সরকার বলছে, তারা জনগণের উদ্বেগ বোঝে; তবে ঋণ নেওয়ার ক্রমবর্ধমান ব্যয় সামলাতে খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখতেই হবে।
ইতিমধ্যে ফ্রান্সের দ্বিতীয় ও তৃতীয় বৃহত্তম শহর মার্সেই ও লিয়ঁয়ে শনিবারের সব পরিকল্পিত বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করা হয়েছে বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। বিচারবিভাগের মন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শনিবার থেকে এ পর্যন্ত ২ হাজার ৭০০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তার পরও আরও অস্থিরতার আশঙ্কা কাটেনি।
সেই আশঙ্কা থেকেই সপ্তাহান্তে সতর্কতামূলক বন্ধের সিদ্ধান্তগুলো এসেছে। মার্সেই চেম্বার অব কমার্স ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে শনিবার বন্ধ রাখতে আহ্বান জানিয়েছে। আর্ট বাসেল প্যারিসের আয়োজকরা জানিয়েছেন, শিল্পমেলাটি পুরো সপ্তাহান্ত বন্ধ থাকবে। শনিবার বন্ধ থাকবে বিখ্যাত লুভর জাদুঘর ও ফন্ডাসিয়ঁ লুই ভিতঁ-ও।
সব মিলিয়ে সপ্তাহান্তের দিকে তাকিয়ে আছে পুরো ফ্রান্স। শিক্ষার্থীদের সমাবেশ, ইয়েলো ভেস্টদের মিছিল আর নিষেধাজ্ঞার মুখে সরকারের কঠোর অবস্থান—এই তিনের সংঘাতে পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তার ওপর নির্ভর করছে ম্যাক্রোঁ সরকারের আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ। শান্তি ফেরাতে সরকারের কৌশল কাজ করবে, নাকি নিষেধাজ্ঞা ক্ষোভ আরও উসকে দেবে—উত্তর মিলবে সপ্তাহান্তেই।




