বাঁচতে নিজের পা কেটে ফেললেন ইউক্রেনীয় সেনা, ৪৯১ দিন পর ড্রোনে করে নাটকীয় উদ্ধার
বোমায় বিধ্বস্ত একটি স্কুলের বয়লারের নিচের সরু গর্তে আটকে থাকা অবস্থায় ভয়ংকর এক সিদ্ধান্ত নিতে হয় ইউক্রেনীয় পদাতিক সেনা কনস্তান্তিন ভ্লাসেঙ্কোকে — বাঁচতে হলে তাঁর অবশিষ্ট একমাত্র পাটিও নিজেকেই কেটে ফেলতে হবে।
এর আগেই ফেব্রুয়ারিতে এক রুশ ড্রোন হামলায় তাঁর বাঁ পা ছিঁড়ে গিয়েছিল। একই হামলায় ডান পা ভেঙে বেঁকে যাওয়ায় হামাগুড়ি দেওয়াও তাঁর জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।
প্রায় তিন মাস সেই অবস্থায় কাটানোর পর সাহস সঞ্চয় করে তিনি ছুরি তুলে নেন, নিজের পা কেটে ফেলেন এবং রক্তক্ষরণ থামাতে টর্নিকেট বাঁধেন। সেই কঠিন সিদ্ধান্তেই এ যাত্রায় তিনি বেঁচে যান।
অবশেষে ৪ অক্টোবর তাঁকে নাটকীয়ভাবে উদ্ধার করা হয়। প্রায় আট মাস বয়লারঘরের গর্তে আটকে থাকার পর এবং ড্রোনে ছেয়ে যাওয়া সম্মুখসারিতে মোট ৪৯১ দিন কাটানোর পর ৪৯ বছর বয়সী এই সেনাকে উদ্ধার করা হয় আকাশপথে।
দূর থেকে নিয়ন্ত্রিত ছয় প্রপেলারের এক বিশাল ড্রোন হার্নেসে ঝুলন্ত অবস্থায় তাঁকে নিয়ে আকাশে ওঠে এবং ১৫ কিলোমিটার দূরের নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেয়। ইউক্রেনীয় কমান্ডারদের ভাষ্য, ড্রোনের মাধ্যমে আকাশপথে কোনো সেনাকে উদ্ধারের এটিই প্রথম জানা ঘটনা।
ভ্লাসেঙ্কো খারকিভ অঞ্চলে মোতায়েন ৩০তম যান্ত্রিক ব্রিগেডে কর্মরত ছিলেন। গত বছরের মে মাসে তাঁকে সম্মুখসারির একটি অবস্থানে পাঠানো হয় ‘বাস্কি’ ডাকনামের এক সঙ্গীর সঙ্গে যোগ দিতে। সংকীর্ণ গর্তে ঠাসাঠাসি করে থাকা দুজনকে প্রতিদিন ড্রোনে করে সরবরাহ পাঠানো হতো; ভ্লাসেঙ্কোর জন্মদিনে চকলেট ও দামি সিগারেটও পৌঁছেছিল।
গত বছরের শরতে বদলির সময় এলে তাঁদের অবস্থানে আসার পথে দুই বদলি সেনা নিহত হন। তাঁদের মরদেহ আনতে পাঠানো আরও দুই সেনাও নিহত হন। বিবাহিত এই পদাতিক সেনার ভাষ্য, তখনই তাঁর মনে হয়েছিল — এটি নিশ্চিতভাবেই মোড় ঘোরানো মুহূর্ত, আর কেউ সেখান থেকে বেরোতে পারবে না।
১০ মাস একসঙ্গে থাকার পর ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি তাঁদের অবস্থান ছাড়তে হয়, কারণ গর্তে পানি জমে গিয়েছিল। তাঁরা আশ্রয় নেন একটি বিধ্বস্ত স্কুলভবনে। কিন্তু সেই স্বস্তি ছিল ক্ষণস্থায়ী — সহযোদ্ধাদের ফেলে যাওয়া শুকনো কাপড় ও খাবারের প্যাকেট আনতে বেরোলে একটি রুশ নজরদারি ড্রোন তাঁদের দেখে ফেলে এবং আরেকটি রুশ ড্রোন বোমা ফেলে।
সেই হামলায় বাস্কি তাঁর ৫০তম জন্মদিনে নিহত হন। বিস্ফোরণে ভ্লাসেঙ্কোর বাঁ পা ছিঁড়ে যায় এবং পড়ে গিয়ে অন্য পাও গুরুতর জখম হয়। নড়াচড়ার ক্ষমতা প্রায় হারিয়ে তিনি স্কুলটি একসময় গরম করা ধাতব বয়লারের নিচে প্রায় ৮০ সেন্টিমিটার লম্বা ও ৬০ সেন্টিমিটার চওড়া একটি গর্তে আশ্রয় নেন।
ভ্লাসেঙ্কোর ভাষ্য, তাঁর বাঁ পা ধীরে ধীরে পচে গিয়েছিল এবং ডান পায়ের আঘাত এতটাই গুরুতর ছিল যে হাড় বেরিয়ে আসে। শেষ পর্যন্ত সেই পা-ও কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। তাঁর কথায়, পা-টি তাঁর পেছনে শুধু ঘষটে যাচ্ছিল বলেই এটি কেটে ফেলতে হয়েছিল।
তিনি যখন আশা প্রায় ছেড়ে দিয়েছিলেন, তখন সম্মুখসারির পেছনে থাকা কমান্ডাররা ৯২তম অ্যাসল্ট ব্রিগেড ও অন্যান্য ইউনিটের সঙ্গে মিলে তাঁকে বের করে আনার উপায় খুঁজছিলেন। অভিযানের পরিকল্পনার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা ‘অ্যালেক্স’ (ডাকনাম) জানান, আকাশে ড্রোনের হুমকির কারণে পিকআপ ট্রাক বা সাঁজোয়া যানে ‘কিল জোন’ থেকে আহতদের সরানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। চালকবিহীন স্থলযান পাঠানোর চেষ্টাও ব্যর্থ হয় — এমন দুটি যান ভ্লাসেঙ্কোর কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করলেও রুশ ড্রোনে দুটিই ধ্বংস হয়ে যায়।
এরপর কর্মকর্তারা স্থানীয় প্রস্তুতকারক গুর্জুফ ডিফেন্সের তৈরি একটি নতুন ভারবাহী ড্রোনের খোঁজ পান। ছয়টি রোটর ও কালো কাঠামোর ড্রোনটি দেখতে বিশাল পোকার মতো; এটি ২৫ কিলোমিটার পর্যন্ত ৯০ কেজি ওজন তুলতে পারে। এক বছরের বেশি সময় সম্মুখসারিতে থাকার পর ভ্লাসেঙ্কোর ওজন দাঁড়িয়েছিল প্রায় ৭০ কেজি। সেই ড্রোনই তাঁকে ১৫ কিলোমিটার উড়িয়ে নিরাপদ অবস্থানে নিয়ে যায়। খারকিভ শহরের হাসপাতালের বিছানা থেকে রয়টার্সকে ভ্লাসেঙ্কো বলেন, ‘আমি নিজেকে আগেই কবর দিয়ে ফেলেছিলাম। আমি জানতাম আর কোনো আশা নেই।’ ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনী ও উদ্ধারকারী ড্রোনের ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজে তাঁর এই দুর্ভোগ ও উদ্ধারের বিবরণের সমর্থন মিললেও রয়টার্স তাঁর বিবরণের সব অংশ স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।






