হরমুজ আবার বন্ধ হলে বিশ্বের তেলের মজুত টিকবে মাত্র এক-দুই মাস: বহু দশকের সর্বনিম্নে জরুরি ভান্ডার
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ নতুন করে পুরোদমে শুরু হয়ে হরমুজ প্রণালি আবার বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্বের জরুরি তেলের মজুত দিয়ে মাত্র এক থেকে দুই মাস চলা সম্ভব হবে বলে সতর্ক করেছেন বিশ্লেষকেরা। দশকের পর দশক ধরে সঞ্চিত কৌশলগত মজুত এরই মধ্যে যুদ্ধের কারণে ব্যাপকভাবে খরচ হয়ে এখন বহু দশকের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।
উদ্বেগের পটভূমি তৈরি করেছে হরমুজ প্রণালি ও তার আশপাশে ট্যাংকারে হামলার বাড়তে থাকা ঘটনা এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরান যুদ্ধ শেষ করার প্রচেষ্টার অচলাবস্থা। এর মধ্যেই তেলের দাম উঠেছে প্রায় পাঁচ মাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম বুধবার ব্যারেলপ্রতি ২ ডলারের বেশি বেড়ে ১১০.৮৫ ডলারে পৌঁছায়, যা পাঁচ মাসের সর্বোচ্চের কাছাকাছি।
এর আগের দিন ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানায়, প্রণালির একটি অবৈধ পারাপার পয়েন্টে মাইনের আঘাতে দুটি ট্যাংকারে আগুন ধরে যায়। তারপর বৃহস্পতিবার আইআরজিসি আরও সাতটি ট্যাংকারে আঘাত হানার দাবি করে, যদিও ওয়াশিংটন সেই দাবি নাকচ করে দিয়েছে। আইআরজিসির বিবৃতিতে বলা হয়, লক্ষ্যবস্তু হওয়া জাহাজগুলোর মধ্যে চারটি তেল স্থানান্তরের কাজে নিয়োজিত ছিল এবং রাতেই সেগুলোতে আগুন ধরে।
উত্তেজনা ছড়িয়েছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ জলপথেও। সেপ্টেম্বরে হুথিরা — আনসার আল্লাহ নামেও পরিচিত সশস্ত্র গোষ্ঠীটি — ইয়েমেনে বাব আল-মানদেব প্রণালির কাছাকাছি এলাকার দখল নেয়। লোহিত সাগরে ঢোকা ও বের হওয়ার এই গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টটি মিসরের সুয়েজ খালের প্রবেশদ্বারও বটে। অর্থাৎ বিশ্বের দুটি প্রধান তেল চলাচলের পথই এখন হুমকির মুখে।
কৌশলগত তেলের মজুত বলতে বোঝায় সরবরাহের জরুরি অবস্থায় ব্যবহারের জন্য সরকারগুলোর নিজে বা কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে নিজেদের পক্ষে রাখা অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানির ভান্ডার। ১৯৭৪ সালে আরব তেল নিষেধাজ্ঞার পর প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) এসব মজুতের বেশির ভাগের সমন্বয় করে। সংস্থার আমদানিকারক সদস্যদের নিট আমদানির অন্তত ৯০ দিনের সমপরিমাণ মজুত রাখতে হয়। চীন ও ভারত এই সংস্থার সদস্য নয়।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর কয়েক দিনের মাথায়, ১১ মার্চ আইইএর ৩২ সদস্য জরুরি সরবরাহ থেকে ৪০ কোটি ব্যারেল তেল ছাড়ের বিষয়ে একমত হয় — যা ২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আক্রমণের পর ছাড় করা পরিমাণের দ্বিগুণেরও বেশি। আইইএর হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র তার কৌশলগত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ (এসপিআর) থেকে ১৭ কোটি ২২ লাখ ব্যারেল এবং জাপান ৭ কোটি ৯৮ লাখ ব্যারেল ছাড়ার প্রতিশ্রুতি দেয়।
কিন্তু সেই খরচের ফল এখন স্পষ্ট। মার্কিন জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এসপিআরের মজুত নেমে এসেছে ২৮ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেলে, যা ১৯৮২ সালের অক্টোবরের পর সর্বনিম্ন। মার্কিন জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের মতে, এই তেলের বড় অংশ বিক্রি নয়, ধার হিসেবে দেওয়া হয়েছিল এবং অতিরিক্ত ব্যারেলসহ তা ফেরত দিতে হবে। অর্থাৎ কাগজে যা আছে, তার সবটুকুই ব্যবহারযোগ্য নয়।
স্পার্টা কমোডিটিজের জ্যেষ্ঠ অপরিশোধিত তেল বিশ্লেষক অ্যারন কিলডো বলেন, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষ থেকে চীন ও ইরান ছাড়া বিশ্বের কৌশলগত মজুত কমেছে প্রায় ৩২ কোটি ৭০ লাখ ব্যারেল, যার প্রায় ৯৫ শতাংশই যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও জাপানের ভাগে। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, এখন বিশ্বজুড়ে ব্যবহারযোগ্য মজুত আছে মাত্র প্রায় ৪০ কোটি ব্যারেল — যার বাইরে রয়েছে চীনের মজুত, যার রপ্তানির সম্ভাবনা নেই, এবং উপসাগরীয় মজুত, হরমুজ পুরোপুরি বন্ধ হলে যা আটকে যেতে পারে। এই ব্যবহারযোগ্য মজুতের প্রায় অর্ধেকই জাপানে। ইউরোপের হাতে আছে প্রায় ৭ কোটি ৬০ লাখ ব্যারেল অনির্ধারিত মজুত, তবে জার্মানির মতো সদস্যরা নিজেদের স্থানীয় জরুরি অবস্থার জন্য কিছু অংশ ধরে রেখেছে। কিলডোর ভাষায়, ‘সময় ও ইচ্ছা — দুই দিক থেকেই ইউরোপ আসল অনিশ্চিত কার্ড।’
চীনের চিত্র তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক। বিশ্লেষণী প্রতিষ্ঠান কেপলারের জ্যেষ্ঠ অপরিশোধিত তেল বিশ্লেষক মুয়ু শু বলেন, চীনের স্থলভাগের অপরিশোধিত তেলের মজুত এখন ১১৩ কোটি ব্যারেল, যা ফেব্রুয়ারির শেষের ১২৩ কোটি ব্যারেল থেকে কমলেও শোধনাগারের প্রায় ৮০ দিনের চাহিদা মেটাতে যথেষ্ট। অন্যদিকে রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতের মজুত তার আমদানির মাত্র আট দিনের সমান — বড় আমদানিকারকদের মধ্যে সবচেয়ে পাতলা ভান্ডারগুলোর একটি।
যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ — দিনে প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল — হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করত। সৌদি আরব তার পূর্বাঞ্চলের তেলক্ষেত্র থেকে পশ্চিমের লোহিত সাগর তীরের ইয়ানবু বন্দরে পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন দিয়ে পরিবহন বাড়িয়ে হরমুজকে পাশ কাটানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু সেই পাইপলাইনেও হামলা হয়েছে, আর ইয়ানবু থেকে দক্ষিণমুখী ট্যাংকারগুলোকে যেতে হয় বাব আল-মানদেব দিয়ে, যেখানে জুলাইয়ে ইরান-সমর্থিত হুথিরা সৌদি জাহাজ চলাচলে অবরোধ ঘোষণা করেছে। শুর হিসাব অনুযায়ী, এ মাসে এখন পর্যন্ত বাব আল-মানদেব দিয়ে নিশ্চিতভাবে মাত্র ৩ লাখ ৭৩ হাজার ব্যারেল সৌদি অপরিশোধিত তেল গেছে, যা ফেব্রুয়ারির পর সর্বনিম্ন; ইয়ানবুর বেশির ভাগ কার্গো এখন মিসর হয়ে উত্তরমুখী যাচ্ছে।
হরমুজ বন্ধ হলে এবং হুথিরা সব সৌদি ট্যাংকার আটকে দিলে উপসাগরীয় উৎপাদকেরা কয়েকটি পাইপলাইন ও ইয়ানবুর উত্তরমুখী পথ দিয়েই কেবল রপ্তানি করতে পারবে, বলেন শু। তাতে মধ্যপ্রাচ্যের অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ বর্তমান দিনে ১ কোটি ৬৮ লাখ ব্যারেল থেকে নেমে দাঁড়াবে প্রায় ৭৫ লাখ ব্যারেলে — অর্থাৎ দিনে প্রায় ৯৩ লাখ ব্যারেলের ঘাটতি। তেলক্ষেত্র, টার্মিনাল ও পাইপলাইনে হামলা হলে ‘সরবরাহ বিঘ্ন আরও মারাত্মক ও দীর্ঘায়িত হতে পারে’ বলেও সতর্ক করেন তিনি।
প্রশ্ন হলো, এই ঘাটতি মজুত দিয়ে কত দিন পূরণ করা যাবে। বিশেষজ্ঞদের উত্তর: খুব বেশি দিন নয় — সম্ভবত মাত্র কয়েক সপ্তাহ। কেপলারের হিসাব করা ঘাটতি যদি কিলডোর চিহ্নিত প্রায় ৪০ কোটি ব্যবহারযোগ্য ব্যারেল দিয়েই মেটাতে হয়, বাস্তবে এই তেল অত দ্রুত ছাড়াও সম্ভব নয়। কিলডো বলেন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মজুত দ্রুত ছাড়া যায়, কিন্তু মার্কিন ব্যারেলগুলো তিন মাস ধরে ধাপে ধাপে ছাড়ার ব্যবস্থা রয়েছে, আর ইউরোপের অবদান অনিশ্চিত।
আইজি গ্রুপের প্রধান বাজার বিশ্লেষক ক্রিস বোশ্যাম্প বলেন, প্রথমবার বন্ধ হওয়ার পর বিশ্ব ভাগ্যবান ছিল। তাঁর ভাষায়, ‘মার্চ ও তার পরের উল্লেখযোগ্য দিক ছিল, আসলে কোনো সংকটই তৈরি হয়নি। আমরা বেঁচে গেছি।’ কিন্তু সতর্ক করে তিনি বলেন, ‘দীর্ঘায়িত সংঘাত হলে এবার বিশ্ব অর্থনীতি এতটা ভাগ্যবান হবে বলে আমি মনে করি না। আমাদের হাতে আছে মাত্র এক বা দুই মাস।’
বিশ্ব আক্ষরিক অর্থে তেলশূন্য হয়ে পড়বে না; বরং দাম এতটাই বাড়বে যে চাহিদার একটা অংশ ঝরে পড়বে। বোশ্যাম্পের মতে, ‘ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলার খুবই বাস্তব সম্ভাবনা হয়ে উঠবে, যা তখন উল্লেখযোগ্য চাহিদা ধ্বংস ডেকে আনবে।’ আইইএ জানিয়েছে, সবচেয়ে তীব্র চাপ পড়বে ডিজেলের ওপর, যার দাম এরই মধ্যে অপরিশোধিত তেলের প্রায় দ্বিগুণ। কিলডো বলেন, শোধনাগারগুলো ডিজেলসমৃদ্ধ অপরিশোধিত তেলের জন্য প্রতিযোগিতায় নামবে — ‘যার খরচ শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়বে ভোক্তার ঘাড়ে।’
এই চাপ সমানভাবে সব জায়গায় পড়বে না। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে উপসাগরীয় রপ্তানির বেশির ভাগ গেছে এশীয় ক্রেতাদের কাছে, আর ভারত ও পাকিস্তান সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে বলে জানান কিলডো। তাদের নিকটতম বিকল্প সরবরাহ পশ্চিম আফ্রিকা থেকে আসে, যা সমুদ্রপথে ২৫ থেকে ২৮ দিনের পথ — অথচ সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ থেকে সময় লাগে মাত্র দুই দিন। কিলডোর ভাষায়, ‘চাপটা সমানভাবে আঘাত হানবে না। যেখানে মজুত সবচেয়ে পাতলা এবং বিকল্প সরবরাহ সবচেয়ে দূরে, সেখানেই এটি সবচেয়ে দ্রুত ও সবচেয়ে কঠিনভাবে আঘাত হানবে।’
এই সংকটের উল্টো পিঠে লাভের বন্যাও আছে। চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে, মার্কিন-ইরান যুদ্ধ চলাকালেই, এক্সনমোবিল ১ হাজার ৪৫০ কোটি ডলার আয় করে, যা চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ; শেভরন পোস্ট করে ১ হাজার ২০০ কোটি ডলার, ছয় বছরের সেরা; আর শেলের আয় দ্বিগুণের বেশি বেড়ে প্রায় ১ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছায়। এই মুনাফার বড় কারণ তেলের উচ্চ দাম। আগস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, এক্সনমোবিল ও শেভরনের মতো কোম্পানিগুলো ‘ঘাটতির ভিত্তিতে অতিরিক্ত অর্থ আয় করছে’। শু বলেন, দ্বিতীয় ধাক্কা এলে শোধনাগারগুলো যুক্তরাষ্ট্র, লাতিন আমেরিকা, পশ্চিম আফ্রিকা ও রাশিয়া থেকে সরবরাহের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়বে, যা মধ্যপ্রাচ্যের বাইরের উৎপাদকদের উচ্চ দামের সুবিধা দেবে। মজুতের ভান্ডার প্রায় খালি হওয়ার এই সতর্কবার্তা তাই শুধু জ্বালানি বাজারের নয়, সারা বিশ্বের ভোক্তা ও অর্থনীতির জন্যই এখন সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার নাম।






