ইনফান্তিনোর পাশে এশিয়া: দুই মাস আগের ‘আস্থাভঙ্গ’ থেকে সরে এসে সমর্থন দিল এএফসি
ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর জন্য বড় স্বস্তির খবর এল এশিয়া থেকে। এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি) আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, তারা ইনফান্তিনোকে ফিফা সভাপতি হিসেবে আরেকটি মেয়াদের জন্য সমর্থন করছে। মাত্র দুই মাস আগেও সংস্থাটি তাঁর বিরুদ্ধে ‘আস্থার মৌলিক লঙ্ঘন’-এর অভিযোগ তুলেছিল — সেই অবস্থান থেকে এই সরে আসা বিশ্ব ফুটবলের রাজনীতিতে বড় মোড়।
শুক্রবার টোকিওতে এএফসির বিশেষ কংগ্রেসে সভাপতি শেখ সালমান বিন ইব্রাহিম আল খলিফা সদস্যদের সামনে ইনফান্তিনোকে বড় আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরে এই সমর্থনের ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, ‘নতুন মেয়াদে ফিফা সভাপতি হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সময় আপনাকে ও আপনার নেতৃত্বকে সমর্থনে আমাদের পূর্ণ প্রতিশ্রুতি আমরা নিশ্চিত করছি।’
এএফসির সদস্য সংখ্যা ৪৭টি। সব সদস্য শুক্রবারের এই দিকনির্দেশনা নাও মানতে পারে, তবে যারা মানবে তারা ইনফান্তিনোর জন্য আরেকটি মেয়াদ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ইনফান্তিনো বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধান হিসেবে চতুর্থ মেয়াদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
ফিফার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে আগামী মার্চে। ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে প্রার্থী হওয়ার শেষ তারিখ ১৮ নভেম্বর, আর এখন পর্যন্ত কেউ প্রার্থী হননি। ফলে মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় প্রতিটি মহাদেশীয় সংস্থার সমর্থনই তাঁর জন্য কার্যত জয়ের পথ সুগম করছে।
শেখ সালমান ইনফান্তিনোকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আপনি এশিয়ার অনেক দেশ সফর করেছেন। আমি এই মহাদেশের অনেক সদস্যের সঙ্গে কথা বলেছি। আমি আপনার অনুভূতি জানি, আর আমার মনে হয় আপনার প্রতিশ্রুতিও পরিষ্কার।’ তিনি ইঙ্গিত দেন, সব এএফসি সদস্য এই সমর্থনের সঙ্গে একমত নাও হতে পারে, তবে অধিকাংশই হবে। ‘আমার অনুভূতি — আমি নিশ্চিত — আমার অধিকাংশ সদস্যের অনুভূতিও তাই,’ বলেন তিনি।
এই অবস্থান শেখ সালমানের জন্য হঠাৎ বদল। মাত্র দুই মাসের কিছু বেশি আগে এএফসি ইউরোপ এবং উত্তর ও মধ্য আমেরিকার ফুটবল সংস্থাগুলোর সঙ্গে মিলে বলেছিল, ইনফান্তিনো ‘আস্থার মৌলিক লঙ্ঘন’ করেছেন। বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল ফিফার ইভেন্টগুলোর — বিশ্বকাপসহ — একটি অংশ বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির ৪২০ কোটি ডলারের পরিকল্পনা, যা পরে বাতিল হয়ে যায়।
সেই ব্যর্থ পরিকল্পনা সাজানোর ক্ষেত্রে করা ‘ভুল’-এর জন্য গত সপ্তাহে জুরিখে ফিফার ৩৭ সদস্যের শাসক পরিষদের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন ইনফান্তিনো; ওই পরিষদের সভাপতিত্বও তিনি নিজেই করেন। এএফসির সমর্থন ঘোষণার সময় এই প্রেক্ষাপটটি সবার জানা থাকলেও মঞ্চে তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়নি।
বক্তব্যে শেখ সালমান মতপার্থক্যের কথা উল্লেখ করলেও বিস্তারিত এড়িয়ে যান। তিনি বলেন, ‘জিয়ান্নি, আমি পরিষ্কার করতে চাই: হ্যাঁ, অতীতে আমাদের কিছু বিষয়ে মতভেদ ছিল, আমরা সেগুলো নিয়ে কথা বলেছি। কিন্তু দুটি বিষয়কে এক করে দেখা ঠিক হবে না। গত কয়েক দিনে জুরিখে আমাদের দেখা হয়েছে, আপনি পরিষ্কার করেছেন যে আমাদের মধ্যে সত্যিকারের বোঝাপড়া রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘অতীত, আমি নিশ্চিত, আমাদের ইতিহাসের অংশ। আমরা সবাই, আমি নিশ্চিত, তা থেকে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নিয়েছি। এখন গুরুত্বপূর্ণ হলো আমরা কীভাবে একসঙ্গে এগিয়ে যাই। আমার মনে হয় সবারই প্রশ্ন আছে, আর আমি নিশ্চিত উত্তর পাওয়া যাবে — সেটা এশিয়ার জন্য হোক বা বিশ্বের বাকি অংশের জন্য।’
ফিফার মিডিয়া দপ্তর ইনফান্তিনোর বিশ্বজুড়ে সফরের প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। ছোট-বড় ফুটবল দেশগুলোর জন্য আরও লাখ লাখ ডলার আর্থিক সহায়তার বিনিময়ে ভোট চাওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবেই এসব সফরকে দেখা হচ্ছে। শেখ সালমানও সেই সফরের কথা তুলে ধরে বলেন, ‘এখানে আসার জন্য ধন্যবাদ। আমি জানি আপনি সব জায়গায় গেছেন। আপনি কীভাবে এটা করেন, আমি জানি না। তবে আমি নিশ্চিত, প্রায় প্রতিটি দেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে আপনি রেকর্ড গড়েছেন।’
হালকা রসিকতায় তিনি এমনও বলেন, হয়তো ইনফান্তিনোর একটি ‘ক্লোন’ আছে। এতে হাসির রোল ওঠে। তবে সবচেয়ে বড় করতালি আসে তাঁর সংক্ষিপ্ত ভাষণের শেষে, যখন তিনি আবার সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন: ‘এক এশীয় পরিবার হিসেবে আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে আপনার সমর্থনে এগিয়ে যেতে প্রস্তুত, জিয়ান্নি। আজ আমি এটা পরিষ্কার করতে চাই।’
এরপর মঞ্চে ওঠেন ইনফান্তিনো নিজে। তাঁর বক্তব্য ছিল হালকা মেজাজের, তবে তিনি কিছু ভুল স্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘যখন আপনি অনেক কিছু করেন, আপনি — আশা করি, যেমন আমরা করেছি, অনেক ভালো কাজও করেন — কিছু ভুলও করেন। তবে গুরুত্বপূর্ণ হলো, যেমনটি আপনি বলেছেন, সবসময় অভিজ্ঞতা থেকে, ভুল থেকে শেখা, ক্ষমা চাওয়া, এগিয়ে যাওয়া, একত্র হওয়া, ঐক্যবদ্ধ হওয়া, আমাদের ভবিষ্যতের জন্য, আপনাদের ভবিষ্যতের জন্য গড়ে তোলা।’
সবচেয়ে বড় করতালি আসে যখন তিনি উল্লেখ করেন, তাঁর নেতৃত্বে ফিফার পৃষ্ঠপোষকতা নেটওয়ার্কে আরও লাখ লাখ ডলার প্রবাহিত হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমি ফিফা সভাপতি হওয়ার আগে আপনাদের প্রত্যেকে — আপনাদের কেউ কেউ এখনো আছেন এবং সেই সময়ের কথা মনে আছে — প্রতি চার বছরে ১০ লাখ ডলার করে পেতেন। আগামী বছরের ১ জানুয়ারি থেকে তা হবে ২ কোটি ৫০ লাখ ডলার।’ এশিয়ার সমর্থনের পেছনে এই আর্থিক প্রতিশ্রুতির ভূমিকা কতটা, তা নিয়ে ফুটবল অঙ্গনে আলোচনা চলবেই।





