…English
বড়লেখা টুডে লোগো
সব বড় ঘটনার খবর — নিজের ভাষায়, প্রতি ঘণ্টায়
প্রচ্ছদ › জাতীয় › খবর
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন — আবদুল কুদ্দুস, চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী, ৫ নং দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়ন পরিষদ
জাতীয়

মৃত্যু দেখে ফিরে এসেছিলেন তোতা মিয়া: বাদুরতলায় আট বছর পরও থামেনি নিখোঁজ জেলেদের জন্য অপেক্ষা

নিজস্ব প্রতিবেদক

বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার সদর ইউনিয়নের সমুদ্র উপকূলবর্তী বাদুরতলা গ্রামে কান পাতলেই আজও শোনা যায় কান্নার শব্দ। এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ি, একই দৃশ্য। কোথাও স্বামী হারানোর শোক, কোথাও বাবা হারানোর কষ্ট, কোথাও প্রিয়জনের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা। একটি ঝড় শুধু কয়েকটি জীবন কেড়ে নেয়নি, রেখে গেছে বছরের পর বছর ধরে চলা শূন্যতা।

এই গ্রামের অনেক মানুষের জীবিকা সমুদ্রের ওপর নির্ভরশীল। মাছ ধরতে গিয়ে তাদের দিনের পর দিন কাটে উত্তাল সাগরে, কখনো ইলিশের আশায়, কখনো শুধু জীবিকার তাগিদে। সমুদ্র তাদের কাছে যেমন জীবনের অবলম্বন, তেমনি মৃত্যুরও এক ভয়ংকর ঠিকানা।

২০১৮ সালের ২১ জুলাইয়ের কথা উঠলেই গ্রামটির বাতাস যেন ভারী হয়ে আসে। সেদিন সমুদ্রগামী একটি বড় ট্রলারে ছিলেন ১৮ জন জেলে। তাদের মধ্যে ১০ জন জীবিত ফিরতে পেরেছিলেন, বাকি আটজন আর ফেরেননি।

বঙ্গোপসাগরের সেই ঝড়ে নিখোঁজ হন ৩০ বছর বয়সী মো. মাসুম মিয়া, ৩৭ বছর বয়সী মো. হিরু মিয়া, ৪০ বছর বয়সী হানিফা ও ৪২ বছর বয়সী কবির মিয়াসহ আরও কয়েকজন। নিখোঁজ আটজনই ছিলেন এই গ্রামের মানুষ, কারও সঙ্গে কারও আত্মীয়তার সম্পর্ক, কেউ প্রতিবেশী। ফলে একজনের খোঁজ নিতে গেলেই সামনে পড়ে আরেকটি শোকাহত পরিবার।

আট বছর পেরিয়ে গেলেও স্বজনদের অনেকেই স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। আজও তারা পথ চেয়ে থাকেন, হয়তো কোনো একদিন ফিরে আসবেন হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলো। এসব পরিবারের মুখে বারবার শোনা যায় একজনের কথা, তোতা মিয়া, সেই ডুবে যাওয়া ট্রলার থেকে জীবিত ফিরে আসা জেলে।

তোতা মিয়া আট বছর আগেও পেশাদার জেলে ছিলেন। উত্তাল সাগর, কালো মেঘ আর ঝড়ো বাতাস তার কাছে নতুন ছিল না। কিন্তু ২১ জুলাইয়ের ঝড় ছিল অন্য রকম। সেই ঝড় তাকে শুধু মৃত্যুর মুখোমুখি করেনি, কেড়ে নিয়েছে তার বহু সঙ্গীকেও।

এখন তোতা মিয়ার বয়স সত্তরোর্ধ্ব। আগের মতো হাঁটাচলার শক্তি নেই, বয়সের ভারে শরীর নুয়ে পড়েছে, কথাও জড়িয়ে আসে। সেই ভয়ংকর অভিজ্ঞতার পর মানসিকভাবেও তিনি বদলে গেছেন, অনেক কথা ভুলে যান, সকালের ঘটনা দুপুরে মনে থাকে না। তবু বিস্ময়করভাবে সেদিনের স্মৃতিগুলো তিনি ভুলে যাননি।

তার বর্ণনায়, সেদিন সমুদ্র উত্তাল দেখে তারা তীরের দিকে ফিরতে শুরু করেন। তখন ট্রলারটি ছিল উপকূলের অদূরে মান্দারবাড়িয়ার চরের কাছাকাছি। তোতা মিয়া বলেন, ঝড় ওঠার আগেই মনে হচ্ছিল আজ কিছু একটা হতে চলেছে, সমুদ্রের অবস্থা ভালো ছিল না। তাই তারা ফ্লুটগুলো, একধরনের সাদা ভাসমান বল, বেঁধে নিয়েছিলেন, বিপদ হলে এগুলোই হয়তো কাজে লাগবে ভেবে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই আশঙ্কা সত্যি হয়। বাতাসের গতি বাড়ে, ঢেউ একের পর এক আছড়ে পড়তে থাকে ট্রলারে। এর মধ্যেই পাশ থেকে আসা প্রবল এক ঢেউয়ে মুহূর্তের মধ্যে উল্টে যায় ট্রলারটি। তারপর শুরু হয় বাঁচার যুদ্ধ। অনেকে ট্রলারের অংশ ধরে ভেসে থাকার চেষ্টা করেন, কেউ আঁকড়ে ধরেন ভাসমান বস্তু, কেউ বয়া। যারা ছিটকে গিয়েছিলেন, তাদের অনেকেই আর ফিরে আসতে পারেননি।

তোতা মিয়া বলেন, একসময় অন্ধকার হয়ে এলে মাঝির কথা মতো সবাই সাঁতার দিতে থাকেন, তারা পশ্চিম দিকে যাচ্ছিলেন। প্রথমে তিনটি বয়া ধরে সবাই পাশাপাশি ছিলেন, মনে হচ্ছিল হয়তো বেঁচে যাবেন। কিন্তু ঢেউয়ের তোড়ে বয়াগুলো একেক দিকে সরে যেতে থাকে, পাশাপাশি থাকা মানুষগুলোর মধ্যেও দূরত্ব বাড়তে থাকে। মেঘ, বৃষ্টি আর বিজলির আলোয় সন্ধ্যার পরও একে অন্যকে দেখা যাচ্ছিল, তারপর আস্তে আস্তে যে যার মতো হারিয়ে যান।

তার স্মৃতিতে এখনও জীবন্ত সেই কণ্ঠগুলো। একসময় বয়া পাশাপাশি থাকায় সবার চিৎকার শোনা যাচ্ছিল, কেউ আল্লাহকে ডাকছিলেন, কেউ মাকে, কেউ বাবাকে, কেউ স্ত্রী-সন্তানের কথা মনে করে কাঁদছিলেন। চারপাশে ছিল শুধু ঢেউ, বৃষ্টি, অন্ধকার আর বাঁচার আকুতি। বয়া দূরে সরে যাওয়ার সঙ্গে সেই কণ্ঠগুলোও দূরে চলে যায়, একসময় আর কারও আওয়াজ শোনা যায়নি।

শেষ পর্যন্ত একটি বয়া ধরে চারজন ভাসছিলেন। ক্লান্তি যে কতটা ভয়ংকর, তা সেদিন চোখের সামনে দেখেন তোতা মিয়া। একজন ক্লান্ত হয়ে বয়া ছেড়ে দেন এবং চোখের সামনে তলিয়ে যান। এরপর তারা তিনজন ছিলেন এক বয়ায়। ঝড়ের তোড়ে বয়া ধরে রাখাই ছিল সবচেয়ে বড় কষ্ট, তবু বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষায় তারা আঁকড়ে ধরে থাকেন, এভাবেই কেটে যায় রাত।

শেষ রাতের দিকে দূরে জঙ্গলের মতো কিছু দেখতে পান তোতা মিয়া। কিছুক্ষণ পর পায়ের তলায় মাটির স্পর্শ অনুভব করেন, বুঝতে পারেন তারা চরে পৌঁছেছেন। সেদিন তারা পৌঁছেছিলেন নারিকেলবাড়িয়া-মান্দারবাড়িয়ায়। সেখানে স্থানীয় ডাকাতরা তাদের সাহায্য করেছিলেন, শুধু কূলে উঠতে সাহায্য করেই থেমে থাকেননি, বাড়ি ফেরার গাড়ি ভাড়ার টাকাও দিয়েছিলেন।

মৃত্যুর মুখ থেকে ফেরার অভিজ্ঞতা তোতা মিয়ার জীবন বদলে দিয়েছে। তার মতে সমুদ্রে বাঁচার কৌশল আছে, যারা অধৈর্য হবে তারা মরবে। এমন পরিস্থিতিতে শুধু ভেসে থাকার চেষ্টা করতে হবে, সাঁতার কেটে কোনো গন্তব্যে যেতে চাইলে হয়রান হয়ে তলিয়ে যেতে হবে। ভেসে থাকতে পারলে ঢেউ একদিকে নিয়েই যাবে। তবে জলোচ্ছ্বাস থাকলে কোনো নিয়মই ঠিক থাকে না, পানির ঘূর্ণি নিচের দিকে টেনে নিলে আর রক্ষা নেই।

তোতা মিয়া যখন সেই রাতের গল্প বলছিলেন, পাশে নীরবে বসে ছিলেন তার স্ত্রী। স্বামীর বেঁচে ফেরার লড়াই তার কাছে পুরোনো গল্প নয়। স্বামীকে ফিরে পাওয়াকে তিনি আজও আল্লাহর সবচেয়ে বড় উপহার মনে করেন। বাদুরতলায় তোতা মিয়া তাদেরই একজন, যিনি একদিন মৃত্যুর হাত ধরে আবার ফিরে এসেছিলেন জীবনের কাছে, আর যারা ফেরেননি, তাদের জন্য গ্রামটির অপেক্ষা আজও শেষ হয়নি।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন — জাকির হোসেন, সম্ভাব্য ইউপি সদস্য পদপ্রার্থী, ৭ নং ওয়ার্ড, ৫ নং দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়ন

জাতীয় বিভাগের আরও খবর

জাতীয়

সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও চড়ছে চালের দাম: এক সপ্তাহে কেজিতে বাড়তি ১ থেকে ৩ টাকা

রাজধানীর বাজারে এক সপ্তাহের ব্যবধানে আবার বেড়েছে চালের দাম। জাত ও মানভেদে প্রতি কেজি চাল কিনতে এখন ক্রেতাদের ১ থেকে ৩ টাকা পর্যন্ত বেশি খরচ করতে হচ্ছ…

জাতীয়

ডিম ও সবজিতে স্বস্তি ফিরলেও চাল-ডাল-তেলে চড়া বাজার: সংসারের খরচ কমছে না সাধারণ মানুষের

শীতের আগমনী হাওয়ায় রাজধানীর বাজারে বাড়তে শুরু করেছে নতুন সবজির সরবরাহ, যার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দামে। সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ায় কমছে ডিমের দামও। …

জাতীয়

ভদ্রাবতী নদীর পাড়ে দেড়শ বছরের সাক্ষী তাড়াশের তিন গম্বুজ মসজিদ

সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার বারুহাঁস গ্রামে ভদ্রাবতী নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে দেড়শ বছরের বেশি পুরোনো এক মসজিদ, যা স্থাপত্যশৈলীর অনন্য নিদর্শন হিসেবে এল…

জাতীয়

অবরোধে পর্যটকশূন্য সাজেক: সংঘর্ষ-গুলিবর্ষণের পর তিন হাজার পর্যটক ফিরলেন খাগড়াছড়ি, বন্ধ ব্যবসা-পরিবহন

রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র সাজেক এখন পর্যটকশূন্য। সড়ক অবরোধকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ ও গুলিবর্ষণের ঘটনার পর বৃহস্পতিবার নিরাপত্তা…