এবারের গ্রীষ্ম ছিল ইউরোপের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাণঘাতী: তাপে মৃত্যু ৫০ হাজারের বেশি, দুই-তৃতীয়াংশের দায় জলবায়ু পরিবর্তনের
এবারের গ্রীষ্মে চরম তাপে ইউরোপে ৫০ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আর এই মৃত্যুর দুই-তৃতীয়াংশের জন্যই দায়ী জলবায়ু পরিবর্তন। দুটি নতুন গবেষণায় উঠে এসেছে এই ভয়াবহ চিত্র।
একাডেমিক জার্নাল নেচার হেলথে প্রকাশিত সমকক্ষ-পর্যালোচিত (পিয়ার-রিভিউড) দুটি গবেষণাই এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে। এই বছরের রেকর্ডভাঙা তাপপ্রবাহ চলাকালে মৃত্যুর প্রথম পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন হিসেবে এগুলোকে চিহ্নিত করা হচ্ছে।
পরিসংখ্যানগুলো এসেছে ইউরোপজুড়ে প্রায় ৮৫০টি শহর থেকে। অর্থাৎ গ্রামাঞ্চলসহ পুরো মৃত্যুসংখ্যা আরও বেশি হবে বলেই গবেষকরা মনে করছেন। তাদের মতে, এই গ্রীষ্ম ছিল এই শতাব্দীর মধ্যে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে প্রাণঘাতী, আগের সব রেকর্ডকে অনেক পেছনে ফেলে।
গবেষণার প্রধান লেখক ও ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের চরম আবহাওয়া গবেষক ক্লেয়ার বার্নস বলেছেন, তারা বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই বলতে পারেন যে ২০২৬ সালের গ্রীষ্ম সম্ভবত ইউরোপের বড় অংশজুড়ে তাপজনিত মৃত্যুর ক্ষেত্রে রেকর্ডে সবচেয়ে খারাপ ছিল।
বার্নস আরও বলেন, এই সংখ্যাগুলো কঠোরভাবে মনে করিয়ে দেয় যে আরও উষ্ণ ও চরম গ্রীষ্মগুলো জনস্বাস্থ্যের ওপর ক্রমেই তীব্র প্রভাব ফেলছে। তিনি বলেন, এই পরিসংখ্যানের পেছনে রয়েছেন প্রকৃত মানুষ, যাদের জীবন হারিয়ে গেছে, এবং প্রকৃত পরিবার, যারা তাদের জন্য শোক করছে।
ইম্পেরিয়াল কলেজ ও লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনের বিজ্ঞানীরা ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, নরওয়ে ও সুইজারল্যান্ডের ৮৫৪টি শহর পরীক্ষা করেছেন। এই শহরগুলো ৩০টি দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশের বাসস্থান।
এই মাসের শুরুতে প্রকাশিত প্রথম গবেষণাটি ২০০০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত জলবায়ু-সংযুক্ত মৃত্যু নিয়ে কাজ করেছে, আর শুক্রবার প্রকাশিত দ্বিতীয় গবেষণাটি ২০২৬ সালকে কেন্দ্র করে করা হয়েছে।
তাপমাত্রার রেকর্ড ও ঐতিহাসিক তাপ-মৃত্যু মডেল বিশ্লেষণ করে দুটি গবেষণাই তাপজনিত অতিরিক্ত মৃত্যুর হিসাব করেছে। গবেষকরা বলছেন, এই পদ্ধতি ধারাবাহিকভাবে এমন ফল দিয়েছে, যা পরে সরকারগুলোর প্রকাশিত আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যানের সঙ্গে মিলে গেছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা আলাদা করতে বিজ্ঞানীরা এই শহরগুলোর প্রকৃত আবহাওয়ার সঙ্গে এমন একটি তাপমাত্রা মডেলের তুলনা করেছেন, যা বৈশ্বিক উষ্ণতা ছাড়া একটি পৃথিবীর চিত্র তুলে ধরে। সেই তুলনা থেকেই বেরিয়ে এসেছে জলবায়ুর দায়ের হিসাব।
তারা দেখেছেন, এই গ্রীষ্মে ওই শহরগুলোতে ৫০ হাজারের বেশি তাপজনিত অতিরিক্ত মৃত্যু ঘটেছে, যার মধ্যে প্রায় ৩২ হাজার মৃত্যুর জন্য দায়ী তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেওয়া জলবায়ু পরিবর্তন।
গবেষণাগুলো আরও দেখিয়েছে, এই বছরের গ্রীষ্ম কতটা ব্যতিক্রমীভাবে প্রাণঘাতী ছিল। ২০০০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে প্রথম গবেষণায় মোট ৪ লাখ ৩০ হাজার তাপজনিত মৃত্যু পাওয়া গেছে, যার প্রায় অর্ধেকের কারণ জলবায়ু পরিবর্তন। অথচ ২০২৬ সালের সংখ্যা আগের রেকর্ডগুলো—২০২২ সালের ২৯ হাজার ও ২০০৩ সালের ২৮ হাজার মৃত্যু—ছাড়িয়ে গেছে।
এবারের গ্রীষ্মের তাপজনিত মৃত্যুর প্রায় এক-তৃতীয়াংশই ঘটেছে জুনের শেষের তাপপ্রবাহের সময়, যা ইউরোপে একাধিক তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙে দিয়েছিল। বয়স্করাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তবে মৃতদের মধ্যে ৬৫ বছরের কম বয়সী প্রায় ৬ হাজার মানুষও রয়েছেন। ইম্পেরিয়ালের সহকারী অধ্যাপক ও গবেষণার সহ-লেখক গ্যারিফালোস কনস্টান্টিনৌডিস বলেছেন, ৮৫ বছর বা তার বেশি বয়সীরাই আনুমানিক মৃত্যুর প্রায় অর্ধেক। তবে তাপজনিত মৃত্যু শুধু বয়স্কদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না—২০ থেকে ৪৪ বছর বয়সীদের মধ্যেও ৮০০-র বেশি অতিরিক্ত মৃত্যুর হিসাব পাওয়া গেছে।





