…English
বড়লেখা টুডে লোগো
সব বড় ঘটনার খবর — নিজের ভাষায়, প্রতি ঘণ্টায়
প্রচ্ছদ › আন্তর্জাতিক › খবর
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন — আবদুল কুদ্দুস, চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী, ৫ নং দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়ন পরিষদ
আন্তর্জাতিক

রিয়াদের বিমানবন্দরে হুতিদের হামলার পর প্রশ্ন: কোথা থেকে আসছে এই অস্ত্রভান্ডার, কেন ঠেকাতে পারছে না সৌদি আরব

নিজস্ব প্রতিবেদক

শনিবার বেলা তিনটা পেরিয়ে গেছে। সৌদি আরবের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ৩ ও ৪ নম্বর টার্মিনালে তখন দারুণ ব্যস্ততা; অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের এই টার্মিনাল দুটিতে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে যাত্রীরা ইমিগ্রেশন পার হচ্ছিলেন, যাঁদের বেশির ভাগই পোশাক দেখে ওমরাহ যাত্রী বলে বোঝা যাচ্ছিল। আনুমানিক সোয়া তিনটার দিকে হঠাৎ তীব্র আলোর ঝলকানি, তারপর বিকট বিস্ফোরণ—মুহূর্তে ঘটনাস্থল ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।

১০ অক্টোবর রিয়াদের এই বিমানবন্দরের ভেতরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সেই দৃশ্য ধরা পড়ে সিসিটিভি ফুটেজে। ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতি বিদ্রোহীরা হামলার দায় স্বীকার করে। ঘটনাস্থলেই ১২ জন নিহত এবং তিন শতাধিক মানুষ আহত হন।

এই হামলা শুধু সৌদি আরবের জন্য নয়, পুরো বিশ্বের জন্যই বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে। মধ্যপ্রাচ্য বহু বছর ধরেই অশান্ত, কিন্তু সৌদি আরব এত দিন সেই অশান্তিকে নিজের সীমানা থেকে দূরে রাখতে অনেকটাই সফল ছিল। যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান দেশটিকে বিনিয়োগ, পর্যটন ও বড় ক্রীড়া আয়োজনের কেন্দ্র হিসেবে বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে তিল তিল করে কাজ করে যাচ্ছিলেন। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ ধরে একের পর এক হুতি হামলা সেই উজ্জ্বল ও শান্ত ভাবমূর্তি একঝটকায় ভেঙে দিয়েছে।

হুতিরা ইয়েমেনের জায়দি সম্প্রদায়ভুক্ত; জায়দিরা শিয়াদের একটি শাখা, অথচ ইয়েমেনের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ সুন্নি। জায়দিরা দেশটির দারিদ্র্যপীড়িত উত্তরাঞ্চলে বসবাস করে। বৈষম্যের অভিযোগ তুলে গত শতকের নব্বইয়ের দশকে হুতিরা প্রথম প্রতিরোধে নামে।

সংগঠনটি শুরুতে ‘আনসার আল্লাহ’ নামে পরিচিত ছিল, যার অর্থ ‘আল্লাহর সমর্থক’। পরে প্রয়াত ধর্মীয় নেতা বদরেদ্দিন আল-হুতির নামানুসারে এর নামকরণ হয়। তাঁর ছেলে হুসেইন আন্দোলনের নেতা ছিলেন; তিনি ২০০৪ সালে সরকারি বাহিনীর হাতে নিহত হন। এরপর বদরেদ্দিনের আরেক ছেলে আবদুলমালিক নেতৃত্ব নেন এবং জ্বালাময়ী বক্তৃতায় পরিচিতি পান—তাঁর নেতৃত্বেই উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বিচ্ছিন্ন একটি গোষ্ঠী রাজধানী সানার নিয়ন্ত্রণকারী আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত হয়।

হুতিদের বড় উত্থান ঘটে ২০১৪ সালে, যখন তারা ঝড়ের গতিতে রাজধানী সানা দখল করে। এর জেরে ২০১৫ সালের মার্চে সৌদি আরবের নেতৃত্বে হুতিবিরোধী সামরিক অভিযান শুরু হয় এবং ইয়েমেনে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে; এতে কয়েক লাখ মানুষ নিহত হন এবং বড় মানবিক সংকট তৈরি হয়। ২০২২ সালে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের সঙ্গে হুতিদের যুদ্ধবিরতি হয়; দেশটির উত্তরাঞ্চলের বড় অংশ এখনো তাদের নিয়ন্ত্রণে।

বর্তমানে হুতিদের হাজার হাজার যোদ্ধা রয়েছে, যারা দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় লড়াইয়ে প্রশিক্ষিত ও দীর্ঘ যুদ্ধে অভিজ্ঞ। ইয়েমেনের জনসংখ্যার বড় অংশ যেসব এলাকায় থাকে, সেগুলো তাদের নিয়ন্ত্রণে। তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন এখন উপসাগরীয় তেলসমৃদ্ধ প্রতিবেশীদের জন্য বড় হুমকি।

হুতিরা তেহরানের নেতৃত্বাধীন ‘প্রতিরোধ অক্ষে’র অংশ; এই অক্ষে রয়েছে লেবাননের হিজবুল্লাহ, ফিলিস্তিনের হামাস ও ইরাকের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী। সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে হুতিদের ইরানের ‘হাতিয়ার’ বলে অভিযোগ করে আসছে—তেহরান তাদের অস্ত্র ও অর্থ দেয় বলে তাদের দাবি; ইরান বরাবরই তা অস্বীকার করেছে। হিজবুল্লাহর মতো হুতিরা ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে ‘চূড়ান্ত কর্তৃপক্ষ’ হিসেবে মানে না, তবে বছরের পর বছর সম্পর্কে ঘনিষ্ঠতা বেড়েছে, বিশেষ করে ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজা যুদ্ধ শুরুর পর।

২০২৪ সালে হুতিরা লোহিত সাগরে ইসরায়েল-সংশ্লিষ্ট দাবি করা পণ্যবাহী জাহাজে হামলা শুরু করে; গাজায় ফিলিস্তিনিদের সমর্থনে এসব হামলা চালানো হচ্ছে বলে তারা জানায়। এ বছর ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরু করলে মার্চে তেহরানের পক্ষে হুতিরা যুদ্ধে যোগ দেয় এবং ইসরায়েলের দিকে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার দাবি করে, যদিও তাতে ইসরায়েলের বড় ক্ষতি হয়নি।

ইরান যুদ্ধের পর হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়ে—যুদ্ধের আগে এই পথ দিয়ে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন হতো। তখন সৌদি তেল রপ্তানির জন্য বাব আল-মানদেব প্রণালি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পথ হয়ে ওঠে; এটি লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তের প্রবেশপথ এবং ভূমধ্যসাগর ও এশিয়ার মধ্যে জাহাজ চলাচলের প্রধান রুট। হুতিরা সরকারি বাহিনীকে হটিয়ে এই প্রণালিসহ লোহিত সাগর উপকূলের বড় অংশ দখল করে নেয় এবং সৌদি জাহাজ ও তেল অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা শুরু করে—বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল রপ্তানিকারক দেশটি ভীষণ বিপদে পড়ে যায়।

হুতিদের দমনে সৌদি আরব সক্রিয় হয়; পরিকল্পনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষায়, প্রস্তাবিত অভিযানের প্রধান লক্ষ্য ছিল হুতিদের দ্রুত অগ্রযাত্রার সাফল্য উল্টে দেওয়া। কিন্তু হুতিরা সেই পরিকল্পনা সফল হতে দেয়নি; পাল্টা হামলা শুরু করে। গত জুলাইয়ে সৌদি আরব সানার বিমানবন্দরে বোমাবর্ষণ করে হুতি প্রতিনিধিদলের অবতরণ ঠেকাতে চেয়েছিল; তারপর থেকে পাল্টাপাল্টি হামলা চলছে। সৌদি কর্তৃপক্ষের ভাষায়, হুতিরা শুধু রিয়াদের কিং খালেদ বিমানবন্দর লক্ষ্য করেই অন্তত ২০ বার হামলা চালিয়েছে; বেশির ভাগ ঠেকানো গেলেও সব ঠেকানো সম্ভব হয়নি—এখানেই এগিয়ে গেছে হুতিরা।

প্রশ্ন হলো, তাদের অস্ত্রভান্ডার এত শক্তিশালী হলো কীভাবে। সানা দখলের পর তারা ইয়েমেনের সরকারি অস্ত্রভান্ডারের বড় অংশ হাতে পায়। পরে ইরানের কাছ থেকে পাওয়া প্রযুক্তি ও যন্ত্রাংশ, চোরাচালান এবং নিজেদের তৈরি ব্যবস্থা মিলিয়ে ভান্ডার আরও সমৃদ্ধ হয়েছে। প্রতিরক্ষা তথ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান জেনসের কৌশলগত অস্ত্র বিশ্লেষক নিরঞ্জন বিএসের মতে, এসব যন্ত্রাংশ মূলত আরব সাগর হয়ে ইয়েমেনে ঢুকেছে।

হুতিদের হাতে রয়েছে নানা ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং আকাশ ও সমুদ্র—দুই পথেই ব্যবহারযোগ্য ড্রোন। মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের কয়েকটি ইরানি মডেল থেকে তৈরি, যার মধ্যে রয়েছে ‘খাইবার শেখান’। স্বল্প পাল্লার ‘আসেফ’ তৈরি ইরানের ‘খালিজ ফার্স’ জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের আদলে। ‘কুদস’ পরিবারের ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের ‘কুদস-৪’ সংস্করণের পাল্লা প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার বলে ধারণা করা হয়। ড্রোনের মধ্যে রয়েছে ‘ওয়ায়েদ-১’ ও ‘ওয়ায়েদ-২’—ইরানের ‘শাহেদ-১৩১’ ও ‘শাহেদ-১৩৬’ একমুখী আক্রমণকারী ড্রোনের স্থানীয় সংস্করণ।

তাদের হাতে ‘প্যালেস্টাইন-২’ নামের দুই ধাপে কাজ করা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও আছে, যার পাল্লা প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার এবং হাইপারসনিক সক্ষমতা রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। ‘তুফান’ ক্ষেপণাস্ত্রকে ইরানের ‘ঘাদর’-এর নতুন নামের সংস্করণ মনে করা হয়; এর পাল্লা এক হাজার ৩৫০ থেকে এক হাজার ৯৫০ কিলোমিটার। এছাড়া রয়েছে ‘বুরকান’ ও ‘বদর’ সিরিজের স্বল্প পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, যেগুলো ইরানি উৎস থেকে পাওয়া বলে ধারণা করা হয়।

মধ্যপ্রাচ্য ইনস্টিটিউটের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান হুতিদের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সহায়তা দিয়েছে, বিশেষ করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবস্থায়। ইরানে তৈরি যন্ত্রাংশ ছোট নৌকা, কনটেইনারবাহী জাহাজ কিংবা ওমান-ইয়েমেন সীমান্ত দিয়ে চোরাই পথে ইয়েমেনে নেওয়া হয়, সেখানে সেগুলো জোড়া লাগানো হয়। হুতিদের অস্ত্র কর্মসূচিতে চীন থেকে যন্ত্রাংশ আসার খবরও গণমাধ্যমে এসেছে, এবং কনফ্লিক্ট আর্মামেন্ট রিসার্চের অনুসন্ধানে এই কর্মসূচিতে সহায়তাকারী বিদেশি সরবরাহকারীদের বড় নেটওয়ার্কের তথ্য মিলেছে।

ফলে কয়েক দশক আগে অস্তিত্ব পাওয়া একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠী আজ মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়—যাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সৌদি আরবের বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা ও বাণিজ্যিক জাহাজ পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে। হরমুজ ও বাব আল-মানদেব—বিশ্ব জ্বালানির দুই প্রধান ধমনি একই সঙ্গে চাপের মুখে থাকায় এই সংঘাতের ঢেউ শুধু উপসাগরেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম ও সরবরাহের ওপর এর প্রভাব আগামী দিনগুলোতেও বড় প্রশ্ন হয়ে থাকবে।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন — জাকির হোসেন, সম্ভাব্য ইউপি সদস্য পদপ্রার্থী, ৭ নং ওয়ার্ড, ৫ নং দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়ন

আন্তর্জাতিক বিভাগের আরও খবর

আন্তর্জাতিক

তিব্বতে ৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে অন্তত ১৬ জন নিহত, ধসে গেছে তিন শতাধিক বাড়ি

চীনের তিব্বতে ৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে অন্তত ১৬ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় বহু মানুষ আহত হয়েছেন।…

আন্তর্জাতিক

মরুভূমির বিস্ময় জেনির গ্রেট মসজিদ: কাদা-মাটির তৈরি বিশ্বের সবচেয়ে বড় মসজিদ টিকে আছে পুরো শহরের ভালোবাসায়

পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মালির বানি নদীর অববাহিকায় জেগে থাকা প্রাচীন শহর জেনিতে দাঁড়িয়ে আছে এক স্থাপত্য-বিস্ময়। এটি গ্রেট মসজিদ অব জেনি — বিশ্বের সর্বব…

আন্তর্জাতিক

একা ইসরায়েল ইরানে আসলে কতটা করতে পারবে? সরকার উৎখাতের লক্ষ্য নিয়ে বিশ্লেষকদের গভীর সংশয়

ইরান ইতিমধ্যে দুই দফা হামলা মোকাবিলা করে টিকে আছে। দেশটির এখনো পাল্টা হামলার সক্ষমতা রয়েছে — শুধু ইসরায়েল নয়, উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলোতেও হামলা …

আন্তর্জাতিক

নির্বাচনের আগে বেলগ্রেডে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে দেড় লাখ মানুষের মহাসমাবেশ, চাপে ভুচিচের দল

সার্বিয়ায় রোববারের গুরুত্বপূর্ণ সংসদ নির্বাচনের আগে বৃহস্পতিবার রাজধানী বেলগ্রেডের কেন্দ্রে বিরোধী শিক্ষার্থী আন্দোলনের সমর্থনে প্রায় দেড় লাখ মানু…