সুনামগঞ্জে নারী শিল্পীর অংশগ্রহণে আপত্তি, বন্ধ হয়ে গেল বাউল গানের আসর
সুনামগঞ্জে নারী শিল্পীর অংশগ্রহণ নিয়ে আপত্তি ওঠায় একটি বাউল গানের আসর বন্ধ হয়ে গেছে। হাওর-বাঁওড়ের এই জেলায় বাউল গান শুধু বিনোদন নয়, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা সংস্কৃতির অংশ—তাই আসর বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা স্থানীয় সংস্কৃতিমহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
জানা গেছে, আসরে নারী শিল্পীর গান পরিবেশনার বিষয়টি নিয়ে আপত্তি তোলা হলে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে যায় যে শেষ পর্যন্ত পুরো আসরটিই বন্ধ করে দিতে হয়। ফলে গান শুনতে আসা শ্রোতাদের হতাশ হয়ে ফিরতে হয় এবং শিল্পীদের পরিবেশনাও আর হয়ে ওঠেনি।
সুনামগঞ্জসহ সিলেট বিভাগের বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল বাউল ঐতিহ্যের জন্য সুপরিচিত। এই অঞ্চলের মরমি গান, সাধক-শিল্পীদের জীবনদর্শন আর আসরকেন্দ্রিক সংস্কৃতি দেশের লোকসংস্কৃতির অন্যতম প্রাণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
বাউল আসরে নারী শিল্পীদের অংশগ্রহণ নতুন কিছু নয়। বহু নারী শিল্পী দীর্ঘদিন ধরে মঞ্চে ও আসরে বাউল গান পরিবেশন করে আসছেন এবং শ্রোতাদের কাছে তাঁদের আলাদা কদরও রয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে শুধু নারী শিল্পীর উপস্থিতির কারণে আপত্তি ওঠা অনেকের কাছেই বিস্ময়ের বিষয় হয়েছে।
স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মীদের একাংশের মতে, বাউল গান সব মানুষের জন্য উন্মুক্ত একটি উদার ঐতিহ্য—জাত, ধর্ম কিংবা লিঙ্গের ভেদাভেদ এই দর্শনের সঙ্গে যায় না। বাউল সাধনার মূল কথাই মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখা, তাই আসরে শিল্পীর পরিচয়ের ভিত্তিতে বাধা দেওয়া ঐতিহ্যের চেতনার পরিপন্থী বলে তাঁরা মনে করেন।
অন্যদিকে আসর বন্ধের ঘটনা গ্রামীণ সাংস্কৃতিক আয়োজনগুলো ঘিরে সামাজিক টানাপোড়েনের বিষয়টিও সামনে এনেছে। পল্লি অঞ্চলে যেকোনো সাংস্কৃতিক আয়োজন করতে গেলে স্থানীয় নানা পক্ষের মনোভাব আয়োজকদের বিবেচনায় নিতে হয়, আর মতবিরোধ দেখা দিলে অনেক সময় আয়োজনই ভেস্তে যায়।
শিল্পীদের জন্য এমন ঘটনা বিশেষভাবে হতাশাজনক। একটি আসরের জন্য শিল্পীরা আগে থেকে প্রস্তুতি নেন, দূর-দূরান্ত থেকে যাতায়াত করেন; শেষ মুহূর্তে আসর বন্ধ হয়ে গেলে তাঁদের শ্রম ও সময় দুটোই বৃথা যায়। নারী শিল্পীদের ক্ষেত্রে এই ধরনের বাধা তাঁদের পেশাগত পথচলাকে আরও কঠিন করে তোলে।
বাউল গান বাংলাদেশের লোকঐতিহ্যের গর্বিত অংশ এবং আন্তর্জাতিকভাবেও এই ঐতিহ্যের স্বীকৃতি রয়েছে। হাওরাঞ্চলের আসরগুলো সেই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার অন্যতম মাধ্যম। ফলে একটি আসর বন্ধ হওয়া মানে শুধু একটি সন্ধ্যার অনুষ্ঠান বন্ধ হওয়া নয়, ঐতিহ্য চর্চার ধারাবাহিকতায়ও ছেদ পড়া।
সংস্কৃতি সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, ভবিষ্যতে এ ধরনের আয়োজনে সব পক্ষের সঙ্গে আগে থেকে আলোচনা করে এমন পরিস্থিতি এড়ানো যাবে, যাতে শিল্পীরা নির্বিঘ্নে গান পরিবেশন করতে পারেন এবং শ্রোতারাও আসরের আনন্দ থেকে বঞ্চিত না হন।
সুনামগঞ্জের এই ঘটনা আবারও প্রশ্ন তুলেছে—ঐতিহ্যের নামে চলা আসরে ঐতিহ্যের উদার চেতনাই যদি উপেক্ষিত হয়, তাহলে সেই ঐতিহ্য টিকবে কীভাবে। উত্তর খুঁজতে হবে স্থানীয় সমাজ, আয়োজক ও সংস্কৃতিকর্মীদের সম্মিলিত উদ্যোগেই।


