সার্বিয়ায় ছাত্র আন্দোলনের চ্যালেঞ্জের মুখে ভুচিচের ১২ বছরের শাসন, রোববারের ভোটে নির্ধারিত হবে ভবিষ্যৎ
সার্বিয়ায় দুই বছর ধরে চলা ছাত্র আন্দোলনের পর রোববার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আগাম সংসদ নির্বাচন, যেটিকে দেশটির ভবিষ্যৎ নিয়ে এক ধরনের গণভোট হিসেবে দেখা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার প্রচারের শেষ দিনে সারা দেশে সমাবেশ হয়েছে, আর এই ভোটে জনতুষ্টিবাদী নেতা আলেকসান্দার ভুচিচের ১২ বছরের ক্ষমতা হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
ভুচিচের আধিপত্যের সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে উঠেছে দুই বছর বয়সী ছাত্র আন্দোলনটি। এই আন্দোলনের কোনো সুস্পষ্ট নেতা নেই, অংশগ্রহণকারীরাও প্রচলিত রাজনীতিতে অভ্যস্ত নন। তবে ‘স্টুডেন্ট লিস্ট-স্টুডেন্টস উইন’ নামের এই প্ল্যাটফর্ম সারা সার্বিয়ায় সরকারবিরোধী ভোটারদের আকৃষ্ট করতে পেরেছে।
স্টুডেন্ট লিস্ট সার্বিয়ার সমাজের নানা অংশ থেকে প্রার্থী দিয়েছে। বেলগ্রেডের দিকে মিছিল করে আসা ছাত্রদের সঙ্গে যোগ দিয়ে তালিকার শীর্ষ প্রার্থী ও হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ইলিয়া স্রদানোভিচ বলেছেন, ইতিহাস নতুন করে লেখা হচ্ছে এবং এই উদ্দীপনা থামানো যাবে না।
সবকিছুর শুরু হয়েছিল ২০২৪ সালের ১ নভেম্বর। সার্বিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর নোভি সাদের রেলস্টেশনের বাইরে কংক্রিটের ছাউনি ধসে পড়ে ১৬ জন নিহত হন। সেই মর্মান্তিক ঘটনাকে দেশটির দুর্নীতি ও অবহেলার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। সমালোচকেরা স্টেশনের ত্রুটিপূর্ণ সংস্কারকাজের সঙ্গে প্রেসিডেন্টের নাম জড়িয়ে প্রশ্ন তোলেন, কারণ তিনি নিজে ওই প্রকল্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন।
প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও শহরের রাস্তায় বিচারের দাবিতে সাপ্তাহিক ছাত্র বিক্ষোভ শুরু হয়। ধীরে ধীরে তা জাতীয় আন্দোলনে রূপ নেয়। কৃষক, অভিনেতা ও বিচারকসহ সমাজের আরও অনেক অংশ এই আন্দোলনে যোগ দেয়। অনেক ক্ষেত্রে আন্দোলনটি স্থানীয় পর্যায়ে সংগঠিত হয়েছে।
ভুচিচের প্রতিষ্ঠিত সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টি (এসএনএস) এই চাপে কেঁপে ওঠে এবং কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেন। ২০২৫ সালের মার্চে বেলগ্রেডে দেশের ইতিহাসের অন্যতম বড় বিক্ষোভ হয়। নেতৃত্বহীন হয়েও ছাত্র আন্দোলন শক্তি বাড়াতে থাকে এবং তারা ছাত্র সমাবেশ বা প্লেনামের মাধ্যমে নিজেদের সংগঠিত করে।
২০২৩ সালের গত নির্বাচনে ভুচিচের দলকে চ্যালেঞ্জ করেছিল ইউরোপীয় ইউনিয়নপন্থী দলগুলোর একটি ঢিলেঢালা জোট, যেটি পরে ভেঙে যায়। এবার তিনি অনেক স্পষ্ট একটি হুমকির মুখোমুখি—এমন একটি ছাত্র আন্দোলন, যেটি মূলধারার বিরোধী দলগুলোকেও পাশ কাটিয়ে এগিয়েছে।
ভুচিচ ২০১৪ সাল থেকে প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতায় আছেন, তার আগের দুই বছর তিনি ছিলেন উপপ্রধানমন্ত্রী। তিনি দুই মেয়াদ প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেছেন এবং তৃতীয় মেয়াদে প্রার্থী হতে পারবেন না। তাই এবার তিনি দলের নেতৃত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর পদে ফেরার লক্ষ্য নিয়েছেন, যে পদ তিনি ২০১৭ সালে ছেড়েছিলেন।
এই ডানপন্থী জনতুষ্টিবাদী নেতা ভিত্তিহীন অভিযোগের ওপর আরও জোর দিয়েছেন—তার দাবি, প্রতিপক্ষ আসলে ছাত্র ও অধ্যাপক নন, বরং সার্বিয়াকে উৎখাত করতে চাওয়া ‘শক্তিশালী বড় শক্তি’। তিনি স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতিকরণ শেষ করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন।
ভুচিচ পশ্চিমের সঙ্গে সতর্ক ভারসাম্য রেখে চলেছেন। তিনি সার্বিয়ার ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রার্থিতাকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন, আবার ইউক্রেনে রাশিয়ার সর্বাত্মক যুদ্ধের জন্য রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিতেও অস্বীকার করেছেন। কয়েকজন সরকারি মন্ত্রী যুদ্ধাপরাধী রাতকো ম্লাদিচের বেলগ্রেডের শেষকৃত্যে অংশ নেওয়ায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন ক্ষোভ প্রকাশ করে এবং এটিকে ‘মহিমান্বিতকরণ’ বলে সমালোচনা করে।
বৈদেশিক নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান হেনরি জ্যাকসন সোসাইটির হেলেনা ইভানোভ বলেছেন, প্রচলিত বিরোধী দলগুলো যেভাবে পারেনি, ছাত্ররা সেভাবে জনগণকে সংগঠিত করতে পেরেছে—আর এটাই ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভুচিচের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তার ভাষায়, বহুদলীয় নির্বাচন ব্যবস্থা চালুর পর থেকে সার্বিয়ার সব নির্বাচনেই ভুচিচ লড়েছেন, তাই তাকে হারানো সহজ হবে না; তবে এবার ভুচিচের জন্যও সময়টা সহজ হবে না।
সার্বিয়ার সংসদে আসন ২৫০টি এবং আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের আওতায় সারা দেশে একটিই জাতীয় নির্বাচনী এলাকা। রোববার ভোট চলবে স্থানীয় সময় সকাল ৭টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত। নিবন্ধিত ভোটার ৬৪ লাখ ৫০ হাজার এবং ১৮ বছরের বেশি বয়সী সবাই কোনো দলের প্রার্থী তালিকার পক্ষে ভোট দিতে পারবেন।
রোববারের ভোটে ১৮টি তালিকা অংশ নিচ্ছে, তবে মাত্র সাতটি তালিকা পূর্ণ ২৫০ জন করে প্রার্থী দিয়েছে। কোনো তালিকা ৩ শতাংশের বেশি ভোট পেলে সেই অনুপাতে তার প্রার্থীরা নির্বাচিত হবেন। কয়েকটি বিরোধী দল স্টুডেন্ট লিস্টের পক্ষে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছে।
ছাত্ররা নিজেরাই প্রার্থী তালিকার বেশিরভাগ নন। প্রার্থীদের মধ্যে আছেন শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, অভিনেতা ও চিকিৎসক, কৃষক ও বিজ্ঞানী। শীর্ষ প্রার্থী ইলিয়া স্রদানোভিচ নোভি সাদের হৃদরোগের অধ্যাপক। তালিকায় আরও আছেন সাবেক বাস্কেটবল তারকা দেজান বোদিরোগা, খ্যাতনামা অভিনেতা তিহোমির স্তানিচ এবং সার্বিয়ার জাতীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর দেজান শোশকিচ।
১১ দফা কর্মসূচিতে ছাত্র আন্দোলন দুর্নীতি নির্মূলের জন্য দায়ীদের গ্রেপ্তারে একটি পুলিশ ইউনিট গঠন, বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়নে নিয়ম ভঙ্গকারী বা সংঘবদ্ধ অপরাধের সঙ্গে যুক্ত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের অপসারণ, সার্বিয়ার পক্ষপাতদুষ্ট গণমাধ্যম সংস্কার করে সরকারি সম্প্রচার মাধ্যমকে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণমুক্ত করা এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষে দলীয় অনুগতদের নিয়োগ বন্ধের দাবি জানিয়েছে। ভুচিচ ও তার দল এসএনএস দুর্নীতি এবং গণমাধ্যমে প্রভাব খাটানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
ইউরোপীয় পর্যবেক্ষকেরা রোববারের ভোট পর্যবেক্ষণ করছেন। তবে ভোটের আগেই কাউন্সিল অব ইউরোপের সংসদীয় পরিষদ (পেস) ‘উত্তেজনাপূর্ণ ও বিভাজনমূলক নির্বাচনী পরিবেশ’ এবং ‘গণভোটসদৃশ আবহের’ কথা বলেছে। সার্বিয়ার নির্বাচন কমিশন বলছে, নির্বাচন অবাধ এবং ব্যালট গোপন থাকবে। অন্যদিকে স্বাধীন পর্যবেক্ষক সংস্থা সিআরটিএ হুমকি ও শারীরিক সহিংসতা, বিরোধী কর্মীদের ওপর নজরদারি এবং মন্ত্রণালয় থেকে স্থানীয় সরকার পর্যন্ত নানা প্রতিষ্ঠানের ‘নির্বাচনী কারসাজিতে’ জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ তুলেছে। ইউরোপীয় সেন্টার ফর প্রেস অ্যান্ড মিডিয়া ফ্রিডমের হিসাব অনুযায়ী, এ বছর সার্বিয়ায় গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের ওপর ১৬০টি হামলা নথিভুক্ত হয়েছে। রোববারের ফলই বলে দেবে, দুই বছরের এই আন্দোলন ব্যালট বাক্সেও ভুচিচের দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটাতে পারে কি না।





