খাওয়ার পর রক্তে শর্করা বাড়া মানেই বিপদ নয়, বলছেন বিশেষজ্ঞরা
রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বেড়ে যাওয়া নিয়ে অনেকের মধ্যেই উদ্বেগ দেখা যায়। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাওয়ার পর রক্তে শর্করা বাড়া শরীরের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়াও হতে পারে — তাই প্রতিটি বৃদ্ধি নিয়েই আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই।
গত কয়েক বছরে দুটি বিস্ময়কর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সুস্থ মানুষেরা এমন ডিভাইস ব্যবহার করতে শুরু করেছেন, যা সারাদিন ধরে তাদের রক্তে শর্করার মাত্রা পরিমাপ করে। অন্যদিকে কেউ কেউ সাদা পাউরুটি ও পাস্তার মতো পরিশোধিত শর্করা সম্পূর্ণভাবে খাদ্যতালিকা থেকে বাদ দিয়ে দিয়েছেন।
লেখক, পডকাস্টার ও সুস্থতাবিষয়ক প্রভাবশালীরা এই ধারণা প্রচার করছেন যে, সবারই রক্তে শর্করার হঠাৎ বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ করা এবং তা এড়িয়ে চলা উচিত। এই চরম দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, রক্তপ্রবাহে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গ্লুকোজ প্রবেশ করতে দেওয়া বিপজ্জনক; এমনকি বিপাকীয় রোগ নেই এমন সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রেও এটি হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, ব্রণ ও মেজাজের ওঠানামার কারণ হতে পারে বলে দাবি করা হয়। তবে এখন বিশেষজ্ঞরা এই ধারণার বিরোধিতা করছেন।
যখন আমরা পরিশোধিত চিনি, ফল বা কার্বোহাইড্রেটসমৃদ্ধ খাবার খাই ও হজম করি, তখন স্বাভাবিকভাবেই রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যায়। কার্বোহাইড্রেট ও চিনি হজমের সময় ভেঙে গ্লুকোজে পরিণত হয়, যা রক্তপ্রবাহে শোষিত হয়। তখন অগ্ন্যাশয় ইনসুলিন হরমোন নিঃসরণ করে, যা গ্লুকোজকে রক্ত থেকে শরীরের কোষে পৌঁছে দেয়, যাতে তা শক্তি উৎপাদনে ব্যবহৃত হতে পারে।
শুধু খাদ্যই নয়, অন্য কারণেও রক্তে গ্লুকোজ বাড়তে পারে। উচ্চমাত্রার ব্যায়ামের সময় অ্যাড্রেনালিনের মতো হরমোন যকৃতকে রক্তপ্রবাহে আরও বেশি গ্লুকোজ ছেড়ে দিতে সংকেত দেয়, যাতে কর্মরত পেশিগুলো অতিরিক্ত জ্বালানি পায় — এমনটাই জানান যুক্তরাষ্ট্রের কানেকটিকাট অঙ্গরাজ্যের ইয়েল স্কুল অব মেডিসিনের পেডিয়াট্রিক এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট জেনিফার শের।
তবে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে চিত্রটা ভিন্ন। তাদের শরীর পর্যাপ্ত ইনসুলিন উৎপাদন করে না, অথবা ইনসুলিন ঠিকমতো কাজ করে না। ফলে খাবার খাওয়ার পর তাদের রক্তে শর্করার মাত্রা বিপজ্জনকভাবে বেড়ে যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে খাদ্যাভ্যাস ও ব্যায়াম সতর্কভাবে নিয়ন্ত্রণ করা এবং রক্তে শর্করার মাত্রা পর্যবেক্ষণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; কিছু মানুষের ইনসুলিন বা মেটফরমিনের মতো ওষুধও নিতে হয়।
যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের পুষ্টি ও খাদ্যনির্বাচন বিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক অ্যাড্রিয়ান ব্রাউন বলেন, "সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা হলো, প্রতিটি গ্লুকোজ স্পাইক ক্ষতিকর।" সাধারণত খাবার খাওয়ার প্রায় এক ঘণ্টা পরে রক্তে শর্করার মাত্রা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায় এবং পরবর্তী দুই ঘণ্টার মধ্যে তা আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। এই বৃদ্ধি স্বল্পস্থায়ী হলে এবং ব্যক্তির বিপাকক্রিয়া স্বাভাবিক থাকলে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই বলে জানান তিনি।
শেরের মতে, সমস্যা তখনই হতে পারে, যখন রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা প্রত্যাশার চেয়ে বেশি সময় ধরে উঁচু অবস্থায় থাকে। এটি ইঙ্গিত দিতে পারে যে শরীর স্বাভাবিকভাবে গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না; এটি ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের লক্ষণ হতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে শর্করার মাত্রা অনেক বেশি থাকলে তা প্রিডায়াবেটিস ও টাইপ-২ ডায়াবেটিসের দিকে নিয়ে যেতে পারে এবং পরে স্নায়ু ও চোখের ক্ষতি, হৃদরোগ ও স্ট্রোকসহ নানা জটিলতা দেখা দিতে পারে।
তবে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ডায়েটিশিয়ান ও জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো নিকোলা গেসের মতে, অতিরিক্ত রক্তশর্করা সরাসরি ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স সৃষ্টি করে — এমন দাবির পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই। বরং শরীরের প্রয়োজনের চেয়ে বেশি খেয়ে ফেললে অতিরিক্ত ক্যালোরি চর্বিতে রূপান্তরিত হয়, ওজন বাড়ে, যা টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকির একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষ নিয়মিত রক্তে শর্করা পর্যবেক্ষণ করেন; এর একটি উপায় কনটিনিউয়াস গ্লুকোজ মনিটর (সিজিএম), যা সারাদিন ধরে মাত্রা পরিমাপ করে। এখন সুস্থ মানুষের মধ্যেও এই ডিভাইসগুলোর ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিক বাজার তৈরি হয়েছে। কিন্তু কিছু বিশেষজ্ঞ সতর্ক করেছেন, যাদের ডায়াবেটিস নেই, তাদের জন্য এগুলো অপ্রয়োজনীয় হতে পারে। ডায়াবেটিসবিহীন অংশগ্রহণকারীদের নিয়ে করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে, তাদের রক্তে শর্করার মাত্রা ৯৬ শতাংশ সময়ই স্বাস্থ্যকর সীমার মধ্যে ছিল। আরও কেউ কেউ সতর্ক করেছেন, এসব ডিভাইস ক্ষতিকর খাদ্যাভ্যাসগত পরিবর্তনকে উৎসাহিত করতে পারে এবং স্বাস্থ্য সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি করতে পারে।
তবে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। জেনিফার শের বলেন, নতুন গবেষণা ইঙ্গিত দিচ্ছে, গ্লুকোজ পর্যবেক্ষণের ডিভাইসগুলো ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে সাহায্য করতে পারে; তবে সিজিএম সত্যিই উপকারী কি না, তা নির্ধারণে আরও প্রমাণ প্রয়োজন।
রক্তে শর্করাকে তুলনামূলক স্থিতিশীল রাখতে কিছু অভ্যাস সহায়ক হতে পারে। পূর্ণ শস্যজাতীয় খাবার ও প্রোটিনসমৃদ্ধ খাদ্য দীর্ঘ সময় তৃপ্ত রাখে; অন্যদিকে সাদা পাউরুটি ও সাদা চালের মতো সাধারণ কার্বোহাইড্রেট দ্রুত রক্তপ্রবাহে শোষিত হয়। খাবারের ক্রমও গুরুত্বপূর্ণ — কার্বোহাইড্রেটের আগে প্রোটিন ও শাকসবজি খেলে খাওয়ার পরের শর্করা-বৃদ্ধি কমতে পারে। প্রোটিন, আঁশসমৃদ্ধ উদ্ভিজ্জ খাদ্য ও স্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত ভারসাম্যপূর্ণ খাবার হজম ধীর করে স্থিতিশীলভাবে শক্তি জোগায়।
ব্রাউন বলেন, "ব্যক্তিভেদে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে; একই ব্যক্তি ঘুম, মানসিক চাপ, শারীরিক কার্যকলাপের মাত্রা অথবা খাওয়া খাবারের ধরন অনুযায়ী ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারেন।" গেসের মতে, কার্বোহাইড্রেট এড়িয়ে চলার পরামর্শ উল্টো ফলও দিতে পারে — দীর্ঘ সীমাবদ্ধতার পর কার্বোহাইড্রেটসমৃদ্ধ খাবার খেলে শর্করা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বেড়ে যেতে পারে। কার্বোহাইড্রেট এখনো ভারসাম্যপূর্ণ খাদ্যের অপরিহার্য অংশ। তবে একটি বিষয় মনে রাখা ভালো — আমাদের অধিকাংশই ইতোমধ্যে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি অতিরিক্ত চিনি খেয়ে থাকি; বরং সেটি কমানোর দিকেই মনোযোগ দেওয়া যেতে পারে। উল্লেখ্য, এ ধরনের তথ্য কেবল সাধারণ তথ্যগত উদ্দেশ্যে দেওয়া হয় এবং চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়।



