মাগুরায় বাস কাউন্টারের ভেতরে গুলিতে নিহত যুবদল নেতা, স্ত্রীর মামলা
মাগুরায় পৌর যুবদল নেতা শাকের হোসেনকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা হয়েছে। বুধবার রাতে নিহতের স্ত্রী শারমিন নাহার রুমা বাদী হয়ে মাগুরা সদর থানায় মামলাটি করেন। বৃহস্পতিবার সকালে মাগুরা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
নিহত শাকের হোসেন ছিলেন মাগুরা পৌর যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক। তিনি দীর্ঘদিন ধরে মাগুরা কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালের রয়েল এক্সপ্রেস পরিবহনের কাউন্টার মাস্টার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। বুধবার ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে ওই কাউন্টারের ভেতরেই দুর্বৃত্তদের গুলিতে তিনি নিহত হন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, বুধবার ভোরে একটি মোটরসাইকেলে করে দুই ব্যক্তি রয়েল এক্সপ্রেস পরিবহনের কাউন্টারের সামনে আসেন। ওই সময় কাউন্টারে থাকা এক নারী যাত্রী পাশের বাথরুমে গেলে মোটরসাইকেলের পেছনে থাকা ব্যক্তি কাউন্টারের ভেতরে প্রবেশ করেন। অভিযোগ উঠেছে, ওই ব্যক্তি শাকের হোসেনকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে দ্রুত পালিয়ে যান।
পরে বাথরুম থেকে ফিরে ওই নারী যাত্রী শাকেরকে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকতে দেখেন। বিষয়টি জানাজানি হলে আশপাশের কাউন্টারের লোকজন তাঁকে উদ্ধার করে মাগুরা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক খন্দকার মাইনুল হাসান জানান, ভোরে শাকেরকে হাসপাতালে আনা হলে সঙ্গে থাকা ব্যক্তিরা প্রথমে জানান তিনি স্ট্রোক করেছেন। তবে হাসপাতালে আনার আগেই তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। ইলেকট্রোকার্ডিওগ্রাম পরীক্ষার মাধ্যমে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে তাঁর শরীরে দৃশ্যমান রক্তপাত পাওয়া যায়নি বলেও জানান তিনি।
মাগুরার পুলিশ সুপার মোল্লা আজাদ হোসেন জানান, প্রথমে স্ট্রোক কিংবা হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে শাকেরের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হয়েছিল। পরে তাঁর মাথায় ক্ষতচিহ্ন পাওয়া গেলে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়। এই ক্ষতচিহ্নের সূত্র ধরেই ঘটনাটি হত্যাকাণ্ড হিসেবে সামনে আসে।
পুলিশ সুপার আরও জানান, হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন ও জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে পুলিশের একাধিক দল কাজ করছে। ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহের পাশাপাশি বিভিন্ন সূত্র ধরে তদন্ত চালানো হচ্ছে। তবে মামলা হলেও ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ।
স্বামীকে হারিয়ে দুই শিশুসন্তান নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন স্ত্রী শারমিন নাহার রুমা। স্বামীর মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। বারবার মূর্ছা যেতে যেতে তিনি বিলাপ করে বলেন, যারা তাঁর স্বামীকে মেরেছে তাদের খবর দেওয়া হোক, তাঁদেরকেও মেরে ফেলা হোক। স্বামীকে ছাড়া দুই মেয়েকে নিয়ে তিনি কীভাবে বাঁচবেন, কীভাবে চলবেন, মেয়েদের এখন কে দেখবে — এসব প্রশ্নই ঘুরেফিরে আসছিল তাঁর কথায়।
নিহত শাকের হোসেন ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাঁর আয়েই চলত স্ত্রী ও দুই মেয়ের সংসার। বড় মেয়ের নাম সামিয়া, বয়স ১১ বছর, আর ছোট মেয়ে মুনতাহার বয়স মাত্র ছয় বছর। বাবাকে হারিয়ে দুই শিশুর ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
পরিবারের সদস্য ও স্বজনদের দাবি, দ্রুত হত্যাকারীদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করতে হবে এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। ভোরের ব্যস্ত টার্মিনাল এলাকায়, নিজের কর্মস্থলের ভেতরে একজন মানুষকে এভাবে গুলি করে হত্যা করার ঘটনা এলাকায় আতঙ্ক ও ক্ষোভ তৈরি করেছে।
এখন সবার চোখ পুলিশের তদন্তের দিকে। ময়নাতদন্তের ফল, ঘটনাস্থলের আলামত এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা মিলিয়ে হত্যাকারীদের শনাক্ত করা যায় কি না, সেটাই নির্ধারণ করবে এই মামলার পরবর্তী গতি। পুলিশ বলছে, একাধিক দল ইতিমধ্যে মাঠে কাজ করছে।





