দিনে তপ্ত, রাতে কনকনে ঠান্ডা: মরুভূমিতে তাপমাত্রা হঠাৎ এত কমে কেন
দিনের বেলায় প্রখর রোদে মরুভূমির বালু এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে, সেখানে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকাও কঠিন। অথচ সূর্য ডুবে যাওয়ার পর সেই মরুভূমিতেই তাপমাত্রা দ্রুত কমে যায়। দিনের অসহনীয় গরমের পর রাতে কখনো কখনো কনকনে ঠান্ডা অনুভূত হয়। একই জায়গায় কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে তাপমাত্রার এত বড় পরিবর্তন ঘটে কেন—এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে মরুভূমির প্রকৃতিতেই।
এর প্রধান কারণ হলো মরুভূমির শুষ্ক বাতাস, আর্দ্রতার স্বল্পতা এবং রাতের আকাশের দিকে তাপ বিকিরণের প্রক্রিয়া। দিনের বেলায় সূর্যের তাপে মরুভূমির বালু ও পাথর দ্রুত উত্তপ্ত হয়। সূর্যাস্তের পর সেই তাপ মহাকাশের দিকে বিকিরিত হতে থাকে।
বাতাসে জলীয় বাষ্প ও মেঘ কম থাকায় তাপ ধরে রাখার মতো প্রাকৃতিক বাধাও সেখানে তুলনামূলক কম থাকে। ফলে রাতের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ভূমি ও তার কাছাকাছি বাতাস অনেকটা ঠান্ডা হয়ে যায়।
মরুভূমিতে বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণও সাধারণত কম থাকে। জলীয় বাষ্প বায়ুমণ্ডলে তাপ ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আর্দ্র অঞ্চলে ভূপৃষ্ঠ থেকে বিকিরিত তাপের একটি অংশ জলীয় বাষ্প শোষণ করে আবার বিভিন্ন দিকে বিকিরণ করে, যার মধ্যে ভূপৃষ্ঠের দিকেও তাপ ফিরে আসে।
কিন্তু মরুভূমির বাতাসে জলীয় বাষ্প কম থাকায় এই প্রক্রিয়ার প্রভাব তুলনামূলক দুর্বল হয়। ফলে রাতের বেলায় ভূমি দ্রুত তাপ হারায় এবং তাপমাত্রা নেমে যেতে থাকে।
রাতের তাপমাত্রা কতটা কমবে, তার ওপর মেঘেরও প্রভাব রয়েছে। মেঘ ভূপৃষ্ঠ থেকে বেরিয়ে যাওয়া অবলোহিত বিকিরণের একটি অংশ শোষণ করে আবার নিচের দিকে বিকিরণ করে। এতে ভূমি থেকে তাপ হারানোর গতি কমে যায়।
অন্যদিকে, আকাশ পরিষ্কার থাকলে তাপ বিকিরণের পথে বাধা তুলনামূলক কম থাকে। মরুভূমিতে মেঘের পরিমাণ কম থাকলে তাই রাতের বেলায় তাপমাত্রা দ্রুত কমতে পারে।
মরুভূমির বালু ও শুষ্ক মাটির উপরিভাগ সূর্যের আলো পেয়ে দ্রুত উত্তপ্ত হয়। তবে এরা পানির মতো বিপুল পরিমাণ তাপ সঞ্চয় করতে পারে না। দিনের বেলায় বালুর উপরিভাগে জমা হওয়া তাপ সূর্যাস্তের পর বিকিরণের মাধ্যমে বেরিয়ে যেতে থাকে।
ফলে দিনের গরমের তুলনায় রাতের তাপমাত্রা অনেক কমে যেতে পারে। অবশ্য বালুর ধরন, মাটির গঠন, বাতাসের গতি ও আর্দ্রতার ওপর এই পরিবর্তনের মাত্রা নির্ভর করে।
মরুভূমির অবস্থান, ঋতু, উচ্চতা, মেঘের উপস্থিতি ও বাতাসের আর্দ্রতার কারণে রাতের তাপমাত্রায় পার্থক্য দেখা যায়। কোনো মরুভূমিতে রাত বেশ ঠান্ডা হতে পারে, আবার অন্য কোনো মরুভূমিতে তাপমাত্রা তুলনামূলক বেশি থাকে। উপকূলের কাছাকাছি আর্দ্র মরুভূমিতে রাতের তাপমাত্রা অনেক সময় অপেক্ষাকৃত উষ্ণ থাকে।
নাসার তথ্য অনুযায়ী, মরুভূমিতে দিনের গড় তাপমাত্রা প্রায় ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলেও কোনো কোনো মরুভূমিতে রাতে তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচেও নেমে যেতে পারে। তবে এটি সব মরুভূমি বা প্রতিটি রাতের জন্য প্রযোজ্য নয়।
মরুভূমির দিন ও রাতের তাপমাত্রার এই বৈপরীত্যের পেছনে মূলত কাজ করে সূর্যের তাপ গ্রহণ এবং রাতের বেলায় সেই তাপ হারানোর পার্থক্য। শুষ্ক বাতাস, মেঘের স্বল্পতা ও দ্রুত উত্তপ্ত হওয়া ভূমি একসঙ্গে এমন পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে দিনের প্রখর গরমের পর রাতেই তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে। এই প্রতিবেদনের তথ্যসূত্র নাসা, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় আবহাওয়া সংস্থা (এনডব্লিউএস) এবং লাইভ সায়েন্স।





