শনিবারের দাঙ্গার দায় কার—এই প্রশ্নে বিভক্ত ফ্রান্স, ছয় মাস পরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ঘিরে তপ্ত রাজনীতি
‘এটা ফ্রান্সের মুখ নয়! আপনারা সংবাদমাধ্যম শুধু শনিবারের বিক্ষোভের সহিংসতা আর ধ্বংসই দেখান। কিন্তু সেটা সংখ্যাগরিষ্ঠ নয়। সেটা ‘আমরা’ নই। সেটা ফ্রান্স নয়!’ প্যারিসের এক বৃক্ষছায়া-ঢাকা রাস্তায় সারি সারি ভাঙা দোকানের জানালার সামনে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলছিলেন এলিজাবেথ। ছড়িয়ে থাকা কাচের টুকরো তখনো রাস্তায়, দেয়ালে লাল রঙে লেখা ফরাসি পুলিশকে গালি দেওয়া গ্রাফিতি, নিচে দাঙ্গার তারিখ—১৭ অক্টোবর। আবেগে তাঁর কণ্ঠ প্রায় কান্নার কাছাকাছি।
কিন্তু শনিবার আসলে ঘটল কী? এই দাঙ্গার পেছনে কারা? লুটপাটের বড় অংশ সুযোগসন্ধানী মনে হলেও সহিংসতাকে দেখা হচ্ছে পূর্বপরিকল্পিত। ছাত্র বিক্ষোভের কয়েক সপ্তাহ পেরিয়ে ঠিক এখনই কেন এই সহিংসতা সাজানো হলো, আর এই ধ্বংসযজ্ঞে সবচেয়ে বেশি লাভবানই বা কে? এসব প্রশ্নের সাদা-কালো উত্তর আকর্ষণীয় হলেও বাস্তবে কাজ করছে বহু কারণ।
জাতীয় পরিষদের প্রেসিডেন্ট ইয়ায়েল ব্রন-পিভে দাঙ্গা ও তা কীভাবে সংগঠিত হয়েছিল, তা নিয়ে সংসদীয় তদন্তের প্রস্তাব করেছেন। এ মাসের শুরুর দিকে ফরাসি গোয়েন্দারা সরকারি মহলকে জানিয়েছিল, ছাত্র বিক্ষোভে বামপন্থী নৈরাজ্যবাদী গোষ্ঠীগুলো জড়িত। তাদের স্বাক্ষর—কালো বৃত্তে ঘেরা বড় হাতের ‘এ’—এই সপ্তাহান্তে ফ্রান্সজুড়ে বহু ভবনে স্প্রে করে আঁকা দেখা গেছে।
ফরাসি সংবাদমাধ্যমে বারবার প্রচারিত হচ্ছে শনিবারের একটি ভিডিও, যেখানে কালো পোশাক পরা, মুখে কালো রুমাল বাঁধা একদল তরুণকে বড় হাতুড়ি বা ছুরির মতো অস্ত্র দিয়ে কয়েকটি পুলিশ ভ্যানে হামলা চালাতে দেখা যাচ্ছে। ল্য ফিগারো পত্রিকায় প্রকাশিত ২৯ সেপ্টেম্বর তারিখের এক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে ছাত্র আন্দোলনকে ছাত্র সংগঠন ও উগ্র বামপন্থী রাজনৈতিক আন্দোলনগুলো কীভাবে ‘নিয়ন্ত্রণ’ করছে, তার বিশদ বিবরণ রয়েছে। প্রতিবেদনের ইঙ্গিত, ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে সহিংসতাকে নির্বাচনী কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছে উগ্র বাম আন্দোলন লা ফ্রঁস আনসুমিজ (এলএফআই)।
ফরাসি প্রতিবেদনগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, শনিবার তিন হাজারের বেশি দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ব্যাপক লুটপাট মূলত ছিল সুযোগসন্ধানী। অনেক তরুণ চুরির মাল, এমনকি নামী ব্র্যান্ডের জুতো পর্যন্ত অনলাইনে বিক্রি করতে গেছেন; কেউ কেউ মুখ ঢাকারও প্রয়োজন মনে করেননি। অনলাইন বিক্রয় প্ল্যাটফর্মগুলো এখন বলছে, যত বেশি সম্ভব লুটকারীকে খুঁজে বের করতে তারা ফরাসি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কাজ করবে। পুলিশ সিসিটিভি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ফুটেজ খতিয়ে দেখছে। প্রেসিডেন্ট মাখোঁ জোর দিয়ে বলেছেন, সহিংসতা বা চুরির জন্য দায়ী সবাইকে বিচারের মুখোমুখি করা হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে উসকানি পেয়ে কেউ কেউ সহিংসতায় যোগ দিয়েছেন—এমন ধারণা থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী গাব্রিয়েল আতাল, যিনি আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের একজন প্রত্যাশী, আরও সহিংসতা থামাতে বাছাই করা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্ল্যাকআউটের আহ্বান জানিয়েছেন। প্রতিবেশী বেলজিয়ামেও গত কয়েক দিনে সহিংস বিক্ষোভ হয়েছে। মঙ্গলবার বেলজিয়ামের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বের্নার কাঁতাঁ সহিংসতার ‘টিকটকীকরণ’ নিয়ে সতর্ক করেছেন—দাঙ্গার ফুটেজ সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে বিপুল সংখ্যক সহজে প্রভাবিত তরুণের কাছে পৌঁছায়। ব্রাসেলস ও লিয়েজের রাস্তার সহিংসতার জন্য তিনি ‘পরিচিত উগ্র বাম গোষ্ঠীগুলোকেও’ দায়ী করেছেন।
ফ্রান্সে প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ ল্যকর্নু ও তাঁর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ শনিবারের নৈরাজ্যের জন্য ‘কট্টর বামদের’ স্পষ্টভাবে দায়ী করেছেন—নুনেজের ভাষায় তারা ‘আগুনে তেল ঢেলেছে’। মঙ্গলবার ল্যকর্নু ‘ছোট ছোট উগ্র বাম ও অতি-বাম গোষ্ঠীর’ পরিকল্পিত ‘বিদ্রোহের’ কথা বলেছেন। এর আগেও তিনি ‘উগ্র বামদের’ বিরুদ্ধে ছাত্র বিক্ষোভকে অস্ত্রে পরিণত করার অভিযোগ তুলেছিলেন।
পুঁজিবাদবিরোধী এলএফআই নেতা জঁ-লুক মেলঁশোঁ, যিনি নিজেও ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট হতে চান, এসব অভিযোগ জোরালোভাবে অস্বীকার করেছেন। মেলঁশোঁ শনিবারের পরিকল্পিত বিক্ষোভে নিজে অংশ নিয়েছিলেন। এক মাস আগে প্যারিসের সামাজিকভাবে বঞ্চিত উপকণ্ঠে সবার জন্য ভালো রাষ্ট্রীয় শিক্ষার দাবিতে শুরু হওয়া ছাত্র বিক্ষোভগুলোতে শুরু থেকেই উপস্থিত তাঁর দলের রাজনীতিকেরা।
সাঁ-দ্যনি উপকণ্ঠে সোমবার এফএসই ছাত্র ইউনিয়নের লিসা কর্দার সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ছাত্ররা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বার্তা বা ছাত্রনেতৃত্বাধীন সংগঠনের মাধ্যমে নিজেরাই সংগঠিত হয়। তাঁদের ভাষায়, রাজনীতিকেরা তাঁদের ‘নিয়ন্ত্রণ’ করছে বা ‘এটা করো, ওটা করো’ বলছে—এমন ইঙ্গিত ‘অপমানজনক’। লিসার কথায়, ‘ছাত্রদের ক্ষোভ আসে একেবারে তৃণমূল থেকে।’
অনেক ফরাসির মধ্যেও শনিবারের সহিংসতাকে রাজনীতিকরণ করা নিয়ে স্পষ্ট হতাশা রয়েছে। লিনা নামের ২৫ বছর বয়সী এক তরুণী বলেন, ‘রাজনীতিকেরা বলির পাঁঠা খুঁজছেন, কিন্তু জিজ্ঞেস করছেন না এসব কেন ঘটল—শনিবারের মূল কারণগুলো। আমরা ভীত ও পরিত্যক্ত বোধ করছি।’ শনিবারের পর থেকে ফ্রান্সের শীর্ষ রাজনীতিকেরা একে অপরের দিকে আঙুল তোলার উৎসবে মেতেছেন।
এর পেছনে বড় কারণ নির্বাচন। ছয় মাস পরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এখানে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ, আর ফরাসি রাস্তার অস্থিরতা সঙ্গে সঙ্গে দেশটির ইতিমধ্যে তপ্ত রাজনীতিতে ঢুকে পড়েছে। বেশির ভাগ জনমত জরিপে দ্বিতীয় স্থানে থাকা মেলঁশোঁ মধ্যপন্থী প্রধানমন্ত্রীকেই ‘নৈরাজ্যের জন্য দায়ী’ বলেছেন—হয় অযোগ্যতার কারণে, নয়তো সবচেয়ে খারাপ কৌশল হিসেবে। তাঁর ইঙ্গিত, শনিবারের আইনশৃঙ্খলাহীনতার পর নিজেদের ‘শৃঙ্খলার দল’ হিসেবে হাজির হতে ল্যকর্নু হয়তো সহিংসতা ঘটতে দিয়েছেন, ‘যাতে জনগণ তাঁর রাষ্ট্রীয় অর্থব্যবস্থার ব্যর্থতা ভুলে যায়।’ উল্লেখ্য, ফ্রান্স ক্রমবর্ধমান রাষ্ট্রীয় ঋণ ও সরকারি ঋণের খরচ নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে।
শনিবারের গোয়েন্দা ব্যর্থতা নিয়েও প্রেসিডেন্ট মাখোঁ ব্যাখ্যা চেয়েছেন এবং নতুন পুলিশি কৌশল চেয়েছেন। দেশজুড়ে বিক্ষোভের ব্যাপক প্রচার সত্ত্বেও রাস্তায় যথেষ্ট পুলিশ ছিল না বলে স্বীকার করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। আগের বিক্ষোভগুলোতে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগের পর এই সপ্তাহান্তে পুলিশকে অনেকটাই অসহায় দেখা গেছে।
প্রেসিডেন্ট পদপ্রত্যাশীদের মধ্যে শনিবারের চমকে দেওয়া দৃশ্যগুলো থেকে রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছেন অভিবাসনবিরোধী ন্যাশনাল র্যালি দলের মারিন ল পেন—তিনি ইতিমধ্যেই জনমত জরিপে অনেক এগিয়ে। ফলে দাঙ্গার দায় নিয়ে বিতর্ক যত তীব্র হচ্ছে, ফ্রান্সের বিভক্তি ততই গভীর হচ্ছে—একদল দেখছে পরিকল্পিত উগ্র বাম সহিংসতা, আরেকদল দেখছে বঞ্চিত তরুণদের জমে থাকা ক্ষোভের বিস্ফোরণ।





