ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমেছে ১১ দশমিক ৬৭ শতাংশ, দাম নিয়েও বাড়ছে চাপ
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি আয়ের সবচেয়ে বড় গন্তব্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজার। মোট রপ্তানির ৬১ শতাংশই যায় এই বাজারে। তবে দীর্ঘদিনের ধারাবাহিকতায় এবার ছেদ পড়েছে—চলতি বছরের প্রথম আট মাসে ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি থেকে আয় এসেছে মাত্র ১ হাজার ১৯৩ কোটি ইউরো, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ১ হাজার ৩৫০ কোটি ইউরো।
অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানি আয় কমেছে ১৫৮ কোটি ইউরো, কমার হার ১১ দশমিক ৬৭ শতাংশ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের তথ্য বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েস (বিএভি) এই চিত্র সামনে এনেছে।
শুধু মোট আয়ই কমেনি, কমেছে পোশাকের একক মূল্যও। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত প্রতি কেজি পোশাকের গড় মূল্য ছিল ১৪ দশমিক ৮৭ ইউরো; চলতি বছরের একই সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ৭৬ ইউরোতে। প্রতি কেজিতে গড় মূল্য কমেছে ৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ। একই সময়ে রপ্তানির পরিমাণ কমেছে ৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেল জানান, দেশে উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও ইউরোপীয় ক্রেতারা পোশাকের বাড়তি দাম দিতে রাজি নন; বরং তাঁরা আরও কম দামে পোশাক সরবরাহের চাপ দিচ্ছেন। এতে রপ্তানিকারকদের ব্যবসায়িক চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দেশের ভেতরের ব্যয়ের চাপ। কারখানাগুলোয় দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি প্রাপ্তির অনিশ্চয়তার মধ্যে উচ্চমূল্য গুনতে হচ্ছে, আবার ফ্যাব্রিকের সুতা সংগ্রহে সরকারের সাম্প্রতিক বিধিনিষেধও খরচ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে একদিকে ইউরোপের বাজারে চাহিদা কমার আশঙ্কা, অন্যদিকে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি—দুই দিক থেকেই চাপে পড়ছেন রপ্তানিকারকেরা।
নিম্নমুখী ধারা কাটিয়ে ওঠার আগেই নতুন উদ্বেগ যোগ করেছে ইউরোপের অস্থির পরিস্থিতি। বাংলাদেশের বড় ক্রেতা দেশ ফ্রান্স, ইতালিসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে হঠাৎ শুরু হওয়া বিক্ষোভ, ভাঙচুর ও লুটপাটের মতো ঘটনা এবং উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতি পোশাক রপ্তানিতে নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে বলে শঙ্কিত রপ্তানিকারকেরা। তাঁদের আশঙ্কা, দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি না হলে ইইউর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি কমতে পারে; এতে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমার পাশাপাশি পোশাকের নতুন চাহিদাও ব্যাহত হতে পারে।
পুরো ইইউ বাজারেই আমদানি কমেছে। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে ইইউভুক্ত দেশগুলো মোট ৬ হাজার ২৯ কোটি ইউরোর পোশাক আমদানি করেছে, যা ২০২৫ সালের একই সময়ে ছিল ৬ হাজার ২৬৯ কোটি ইউরো—কমেছে ৩ দশমিক ৮৩ শতাংশ। একই সময়ে প্রতি কেজি পোশাকের গড় আমদানি মূল্য ১৯ দশমিক ৯১ ইউরো থেকে কমে ১৯ দশমিক ৬৫ ইউরোতে নেমেছে, অর্থাৎ ১ দশমিক ২৯ শতাংশ কম।
প্রতিযোগীদের মধ্যে চীনের অবস্থান তুলনামূলক ভালো। প্রথম আট মাসে চীনের পোশাক রপ্তানি ২ দশমিক ৩৮ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯৭১ কোটি ইউরো; রপ্তানির পরিমাণ বেড়েছে ৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ, যদিও প্রতি কেজির গড় মূল্য কমেছে ১ দশমিক ০৪ শতাংশ।
ভিয়েতনামের চিত্র আবার ভিন্ন। দেশটির পোশাক রপ্তানি আয় ৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ বেড়ে ৩০০ কোটি ইউরোতে পৌঁছেছে, যদিও রপ্তানির পরিমাণ কমেছে ৫ দশমিক ১৩ শতাংশ। কারণ, প্রতি কেজি পোশাকের গড় মূল্য বেড়েছে ১০ দশমিক ১১ শতাংশ—অর্থাৎ পরিমাণ কম বিক্রি করেও তুলনামূলক বেশি দাম পাওয়ায় দেশটির আয় বেড়েছে। এই দামের সুবিধা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে উল্টো দিকে কাজ করছে।
ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের অন্য প্রতিযোগীদের বেশির ভাগেরই রপ্তানি কমেছে। এই সময়ে তুরস্কের রপ্তানি কমেছে ১১ দশমিক ০২ শতাংশ, ভারতের ১০ দশমিক ৮৪, শ্রীলঙ্কার ১১ দশমিক ১২, ইন্দোনেশিয়ার ১১ দশমিক ০৩, পাকিস্তানের ৯ দশমিক ৬৩, মরক্কোর ৬ দশমিক ১০ এবং কম্বোডিয়ার ৪ দশমিক ৫১ শতাংশ।
তবে পরিমাণ ও দামের প্রভাব দেশভেদে এক রকম নয়। পাকিস্তানের রপ্তানির পরিমাণ ৩ দশমিক ৮২ শতাংশ বাড়লেও প্রতি কেজির গড় মূল্য কমেছে ১২ দশমিক ৯৬ শতাংশ। বিপরীতে কম্বোডিয়ার রপ্তানির পরিমাণ কমেছে ১১ দশমিক ৬৩ শতাংশ, কিন্তু প্রতি কেজির গড় মূল্য বেড়েছে ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ।
সব মিলিয়ে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক খাত এখন ত্রিমুখী চাপের মুখে—আয় কমা, দাম কমা এবং দেশে উৎপাদন ব্যয় বাড়া। রপ্তানিকারকদের আশঙ্কা, ইউরোপের রাজনৈতিক অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে এবং ক্রেতাদের দাম কমানোর চাপ অব্যাহত থাকলে বছরের বাকি সময়েও এই ধারা অব্যাহত থাকতে পারে। খাতটির জন্য এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, কীভাবে দামের প্রতিযোগিতায় টিকে থেকে হারানো বাজার পুনরুদ্ধার করা যায়।


