বিসর্জনের রাতে পুরান ঢাকায় উৎসবের রেশেও বিদায়ের বিষাদ: শাঁখারী বাজার থেকে লক্ষ্মীবাজারে ঢাকের তালে বিদায় দুর্গাকে
ঢাকের বাদ্য, কাঁসর-ঘণ্টার শব্দ আর ভক্তদের উচ্ছ্বাসে মুখর শাঁখারী বাজার, তাঁতীবাজার ও লক্ষ্মীবাজার। কারও হাতে ফুল, কারও চোখে জল। কেউ নাচছেন, কেউ গানের তালে তালে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানাচ্ছেন। উৎসবের আনন্দের মধ্যেই তাদের মনে উঁকি দিচ্ছে বিষাদ, আরও একটি বছরের জন্য মর্ত্য ছেড়ে কৈলাসে ফিরে যাচ্ছেন দেবী।
দেবী বিসর্জনের দিনটিতে বিষাদের পাশাপাশি উৎসবমুখর হয়ে উঠেছিল সারাদেশ। বিজয়া দশমীর রাতে পুরান ঢাকার হিন্দু অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে ছিল এমনই দৃশ্য।
এবারের দুর্গাপূজায় শাঁখারী বাজার, তাঁতীবাজার, লক্ষ্মীবাজারসহ আশপাশের এলাকায় ছিল বাড়তি জাঁকজমক। মণ্ডপে মণ্ডপে মানুষের ভিড়, আলোকসজ্জা, ঢাকের তালে নাচ আর সম্মিলিত আনন্দে উৎসবের দিনগুলো হয়ে উঠেছিল প্রাণবন্ত।
কিন্তু দশমীর রাতে বিদায়ের ক্ষণ যত ঘনিয়ে আসে, আনন্দের সেই আবহে ততই মিশে যায় বিচ্ছেদের বেদনা। কয়েক দিনের মিলনমেলা শেষ হওয়ার ক্ষণও এটি অনেকের কাছে।
পুরান ঢাকার অলিগলিতে দুর্গাপূজা কেবল ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘদিনের সামাজিক বন্ধন, পারিবারিক স্মৃতি ও প্রতিবেশীদের সম্মিলিত অংশগ্রহণ এই উৎসবকে দিয়েছে আলাদা মাত্রা। তাই দেবীকে বিদায় জানানোর মুহূর্তে এটি কেবল একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার সমাপ্তি নয়।
শাঁখারী বাজারের একটি পূজামণ্ডপে উপস্থিত প্রেয়সী চক্রবর্তী বলেন, 'সারা বছর আমরা এই দিনগুলোর জন্য অপেক্ষা করি। পূজার সময় আত্মীয়স্বজন, বন্ধু আর পরিচিত মানুষের সঙ্গে দেখা হয়। সবাই মিলে আনন্দ করি। কিন্তু দশমী এলেই মনে হয়, সময়টা এত তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেল কেন! দেবীকে বিদায় জানাতে গিয়ে আনন্দের মধ্যেও মনটা খারাপ হয়ে যায়।'
তার মতে, 'পূজার কয়েকটি দিন পুরান ঢাকার পরিচিত গলিগুলোও যেন নতুন রূপ পায়। মণ্ডপে মণ্ডপে মানুষের আনাগোনা, সাজসজ্জা আর সাংস্কৃতিক আয়োজনের মধ্যে তৈরি হয় এক ধরনের সম্মিলিত আনন্দ। দশমীর রাতে সেই পরিবেশের মধ্যেই ফিরে আসে আগামী বছরের অপেক্ষা।'
তাঁতীবাজার এলাকায় পূজার আয়োজনে অংশ নেওয়া সুনন্দা সাহা বলেন, 'এবারের পূজায় মানুষের অংশগ্রহণ আর আয়োজন দেখে খুব ভালো লেগেছে। সবাই মিলে আনন্দ করেছি, ঘুরেছি, পরিচিত মানুষের সঙ্গে সময় কাটিয়েছি। এখন দেবী বিদায়ের সময় এসে মনে হচ্ছে, আবার একটা বছর অপেক্ষা করতে হবে। ঢাকের শব্দ আর মণ্ডপের এই পরিবেশ খুব মিস করব।'
পুরান ঢাকার দুর্গাপূজায় বিশেষ করে দশমীর রাতে আনন্দের প্রকাশও কিছুটা আলাদা। ঢাকের তালে নাচ, একে অন্যের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় এবং প্রতিমা বিসর্জনের প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে ভক্তরা দেবীকে বিদায় জানান। কোথাও কোথাও বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতার আগে ভক্তদের মধ্যে আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়।
অনেকে দেবীর কাছে প্রার্থনা করেন, আগামী বছর যেন আবারও আনন্দ ও শান্তির বার্তা নিয়ে ফিরে আসেন তিনি।
লক্ষ্মীবাজারের পূজামণ্ডপে উপস্থিত সুপ্রভা দত্ত বলেন, 'দেবী দুর্গা আমাদের কাছে শক্তি, সাহস ও আশার প্রতীক। পূজার সময় আমরা সবাই একসঙ্গে আনন্দ করি। দশমীতে তাঁকে বিদায় জানানোর সময় তাই মনটা ভারী হয়ে আসে। তবে এই বিদায়ের মধ্যেই আগামী বছরের পূজার অপেক্ষা শুরু হয়। আমরা চাই, সবাই ভালো থাকুক, সমাজে শান্তি থাকুক, আগামী বছর আরও আনন্দ নিয়ে পূজা করতে পারি।'
এবারের পূজায় পুরান ঢাকার বিভিন্ন মণ্ডপে সাজসজ্জা ও উৎসবের আয়োজন ছিল চোখে পড়ার মতো। পূজার দিনগুলোতে পরিবার-পরিজন নিয়ে মণ্ডপে আসেন অনেকে। স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি আশপাশের এলাকার মানুষের উপস্থিতিতেও মুখর হয়ে ওঠে বিভিন্ন সড়ক ও অলিগলি। উৎসবের এই আবহে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ ও পারস্পরিক সম্প্রীতির বিষয়টিও সামনে এসেছে।
তবে এত আয়োজনের পর বিদায়ের রাতে ভক্তদের মনে আনন্দের পাশাপাশি কাজ করেছে শূন্যতার অনুভূতি। কয়েক দিনের ব্যস্ততা, মণ্ডপে মণ্ডপে মানুষের ভিড় আর পরিচিত মুখগুলোর সঙ্গে দেখা হওয়ার সুযোগ শেষ হয়ে আসায় অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। কেউ স্মৃতি ধরে রাখতে ছবি তোলেন, কেউ পরিচিতদের সঙ্গে শেষবারের মতো শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।
এদিকে, দুর্গাপূজাকে ঘিরে পুরান ঢাকার সার্বিক নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কে এম রবিউল ইসলাম। তিনি বলেন, 'এ বছর পুরান ঢাকায় দুর্গাপূজা সুন্দরভাবে সম্পন্ন হয়েছে। পূজাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন মণ্ডপে যেন শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় থাকে, সেজন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। পূজার আয়োজক, স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতায় সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হয়েছে।'
তিনি বলেন, 'পুরান ঢাকার এলাকাগুলোতে পূজামণ্ডপের অবস্থান, মানুষের চলাচল এবং উৎসবের সময় জনসমাগমের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে দায়িত্ব পালন করা হয়েছে। আয়োজকদের সঙ্গে সমন্বয় রেখে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে, যাতে ভক্তরা নির্বিঘ্নে পূজার আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নিতে পারেন। উৎসবের দিনগুলোতে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল। সব মিলিয়ে এবার পূজার আয়োজন শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হওয়ায় আমরা সন্তুষ্ট।'
রাত যত বাড়ে, পুরান ঢাকার অলিগলিতে ততই স্পষ্ট হয়ে ওঠে বিদায়ের আবহ। ঢাকের শব্দের সঙ্গে ভক্তদের নাচ-গান চলতে থাকে, আবার কারও চোখে জমে ওঠে জল। আনন্দ আর বিষাদের এই মিশ্র অনুভূতির মধ্য দিয়েই দেবী দুর্গাকে বিদায় জানান তারা। দেবী চলে যাবেন, মণ্ডপের আলোও একসময় নিভে আসবে। ফিরে আসবে পুরান ঢাকার চেনা ব্যস্ততা। কিন্তু শাঁখারী বাজার, তাঁতীবাজার ও লক্ষ্মীবাজারের ভক্তদের মনে থেকে যাবে কয়েক দিনের উৎসব, প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানো সময় আর দশমীর রাতের সেই আবেগঘন মুহূর্তগুলো। বিদায়ের মধ্য দিয়েই তাই শুরু হবে নতুন করে অপেক্ষা, আগামী বছরের দুর্গাপূজার।



