কারাগারে ট্রান্সজেন্ডার বন্দীদের চিকিৎসা বন্ধের নীতি স্থগিতই থাকল সুপ্রিম কোর্টে
যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট বুধবার রায় দিয়েছেন যে ফেডারেল কারাগারগুলোতে ট্রান্সজেন্ডার বন্দীদের লিঙ্গ-নিশ্চিতকরণ চিকিৎসা আপাতত চালিয়ে যেতেই হবে ট্রাম্প প্রশাসনকে। এই সিদ্ধান্তের ফলে নিম্ন আদালতের নিষেধাজ্ঞা বহাল রইল।
জরুরি আপিলে দেওয়া এই সিদ্ধান্তে কারাগার ব্যুরোর (বিওপি) সেই নীতি কার্যকর করা যাচ্ছে না, যার মাধ্যমে ট্রান্স বন্দীদের হরমোন থেরাপিসহ অন্যান্য চিকিৎসা বন্ধ করে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল প্রশাসনের।
আদালতের আদেশে সিদ্ধান্তের কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। সংক্ষিপ্ত আদেশে শুধু বলা হয়েছে, প্রধান বিচারপতির কাছে উপস্থাপিত এবং তার মাধ্যমে আদালতে পাঠানো স্থগিতাদেশের আবেদনটি খারিজ করা হলো।
তবে বিচারপতি ক্ল্যারেন্স থমাস ও স্যামুয়েল আলিতো প্রশাসনের পক্ষে ছিলেন—তারা স্থগিতাদেশের আবেদনটি মঞ্জুর করতেন বলে আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনার শুরু চলতি বছরের গ্রীষ্মে। তখন ফেডারেল জেলা বিচারক রয়েস ল্যামবার্থ বিওপিকে এই নীতি বাস্তবায়ন করতে নিষেধ করেন। এরপর ডিস্ট্রিক্ট অব কলাম্বিয়া সার্কিটের আপিল আদালতও প্রশাসনের সেই আদেশ স্থগিতের আবেদন নাকচ করে দেয়।
দুই আদালতে ব্যর্থ হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সলিসিটর জেনারেল ডি. জন সাউয়ার সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ চান। কিন্তু সর্বোচ্চ আদালতও আপাতত নিম্ন আদালতের নিষেধাজ্ঞাই বহাল রাখলেন। ফলে নীতিটি নিয়ে আইনি লড়াই আরও চলবে।
মামলায় যুক্ত আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়নের (এসিএলইউ) জ্যেষ্ঠ আইনজীবী লি নওলিন-সোলের মতে, বিওপির হেফাজতে থাকা মানুষের মধ্যে দুই হাজারের বেশি মানুষ নিজেদের ট্রান্সজেন্ডার হিসেবে পরিচয় দেন। উল্লেখ্য, ২০২৫ সালে ট্রাম্প দায়িত্ব নেওয়ার পর বিওপি ট্রান্সজেন্ডার বন্দীদের তথ্য প্রকাশ বন্ধ করে দিয়েছে; ফেডারেল ব্যবস্থায় এখন শুধু পুরুষ বা নারী হিসেবেই বন্দীদের নথিভুক্ত করা হয়।
নওলিন-সোল জানান, 'কিংডম বনাম ট্রাম্প' নামের এই মামলাটি এক হাজার বন্দীর প্রতিনিধিত্ব করে, যাদের জেন্ডার ডিসফোরিয়া রোগ নির্ণয় হয়েছে। এসিএলইউর ধারণা, তাদের মধ্যে প্রায় ৮০০ জনকে হরমোন থেরাপি দেওয়া হয়েছে এবং অনেকে সামাজিক রূপান্তরের সুযোগ-সুবিধাও পাচ্ছেন।
স্থগিতাদেশ চেয়ে করা আবেদনে ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তি দিয়েছিল, এই চিকিৎসা দেওয়ার নানা ঝুঁকি রয়েছে—এই বিশেষ চিকিৎসা পাওয়া বন্দীরা অন্যদের আক্রমণের লক্ষ্য হতে পারেন। প্রশাসন আরও বলেছিল, এতে ন্যায্যতার প্রশ্ন ওঠে এবং অন্য বন্দীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের সংগঠন ওয়ার্ল্ড প্রফেশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর ট্রান্সজেন্ডার হেলথের মতে, জেন্ডার ডিসফোরিয়ার চিকিৎসায় লিঙ্গ-নিশ্চিতকরণ চিকিৎসা চিকিৎসাগতভাবে প্রয়োজনীয়; এর মধ্যে হরমোন থেরাপি ও অস্ত্রোপচার অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। অবশ্য প্রশাসন তাদের আবেদনে এই সংগঠনের যত্নের মানদণ্ড নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে।
এসিএলইউ পাল্টা যুক্তিতে বলেছে, বিওপি অন্তত ১৯৯২ সাল থেকে জেন্ডার ডিসফোরিয়ায় আক্রান্তদের চিকিৎসা দিয়ে আসছে। তাদের ভাষায়, এই চিকিৎসা রোগীদের জন্য অকার্যকর বা ক্ষতিকর হলে, কিংবা নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে, প্রশাসনিক নথিতে বিওপি নিশ্চয়ই তা উল্লেখ করত—এমন কোনো উল্লেখ না থাকাটা তাদের কাছে একটি স্পষ্ট ঘাটতি, যা থেকে মনে হয় সরকারের বর্তমান যুক্তিগুলো সাজানো।
উল্লেখ্য, এই সিদ্ধান্ত সুপ্রিম কোর্টের অন্য কয়েকটি সাম্প্রতিক রায়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক চিত্র তৈরি করেছে। গত জুনে আদালত রায় দিয়েছিলেন, সরকারি অর্থায়নের স্কুলে ট্রান্সজেন্ডার মেয়েদের খেলাধুলায় অংশ নেওয়া রাজ্যগুলো নিষিদ্ধ করতে পারবে। আর ২০২৫ সালে আদালত অপ্রাপ্তবয়স্কদের লিঙ্গ-নিশ্চিতকরণ চিকিৎসা নিষিদ্ধ করা রাজ্য আইনগুলো বহাল রেখেছিলেন।
দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রথম দিকের নির্বাহী আদেশগুলোর একটিতে ঘোষণা করা হয়েছিল, তার প্রশাসন শুধু দুটি লিঙ্গ—পুরুষ ও নারী—স্বীকার করে। সেই আদেশটিই প্রশাসনের ট্রান্সবিরোধী বহু নীতির ভিত্তি হয়ে আছে। তবে কারাগারের চিকিৎসা প্রশ্নে আপাতত সেই নীতি থামিয়েই রাখলেন সর্বোচ্চ আদালত।





