রংপুরের কারুপণ্য কারখানায় আরআইবিএ পুরস্কার, বিশ্ব স্থাপত্যে বাংলাদেশের অনন্য ধারা
রয়েল ইনস্টিটিউট অব ব্রিটিশ আর্কিটেক্টসের (আরআইবিএ) মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছে রংপুরের কারুপণ্যের গ্রিন ফিল্ড কারখানা। স্থপতি বায়েজিদ খন্দকার ও তার প্রতিষ্ঠান ‘নকশাবিদ আর্কিটেক্টস’-এর নকশা করা এই প্রকল্প বাংলাদেশের ঝুলিতে আরও একটি স্থাপত্যের গৌরব যোগ করেছে।
বাংলাদেশের কোনো ভবনের এই পুরস্কার জেতার ঘটনা এটিই প্রথম নয়। সাতক্ষীরার ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালের স্থপতি কাশেফ চৌধুরী ২০২১ সালে এটি জিতেছিলেন। ২০১৫ সালে সূচনার পর থেকে এই পুরস্কারের জন্য মোট পাঁচজনকে পুরস্কৃত করা হয়েছে, যাদের মধ্যে দুজনই বাংলাদেশের।
কারুপণ্যের কারখানাটি বাছাই করা হয়েছিল চারটি সংক্ষিপ্ত তালিকাভুক্ত প্রকল্প থেকে, যার দুটি ছিল বাংলাদেশের। অন্যটি ছিল ঢাকায় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস, যার নকশা করেছে সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠান ডব্লিউওএইচএ।
এই সংক্ষিপ্ত তালিকাটি নির্বাচন করা হয়েছিল আরআইবিএ ইন্টারন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ডস ফর এক্সিলেন্স ২০২৬-এ তালিকাভুক্ত ৩৪টি প্রকল্প থেকে। ওই তালিকায় বাংলাদেশের আরও একটি প্রকল্প ছিল—‘মরফোজেনেসিস’ প্রতিষ্ঠানের সায়কা ইকবাল মেঘনার নকশা করা জেবুন নেসা মসজিদ।
বাংলাদেশের স্থপতিরা এর আগেও অনেক উল্লেখযোগ্য আন্তর্জাতিক পুরস্কার জিতেছেন। এর মধ্যে রয়েছে স্থাপত্যের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ‘আগা খান অ্যাওয়ার্ড ফর আর্কিটেকচার’। কাশেফ চৌধুরী ও মারিনা তাবাসসুম পৃথকভাবে ২০১৬ সালে, সাইফুল হক ২০১৯ সালে এবং খন্দকার হাসিবুল কবির, সুহেইলী ফারজানা, রিজভী হাসান, খাজা ফাতমি ও সাদ বিন মোস্তফা ২০২২ সালে এটি জেতেন।
মারিনা তাবাসসুম ২০২৫ সালে পুনরায় এই পুরস্কার জয়লাভ করেন, একই স্থপতি হিসেবে দ্বিতীয়বার জয়ের রেকর্ড তৈরি করে। বাংলাদেশে এই পুরস্কারপ্রাপ্ত অন্যান্য প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে গ্রামীণ ব্যাংক হাউজিং প্রজেক্ট এবং লুই আই কান নকশাকৃত বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ ভবন।
এই পুরস্কার জেতার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয় সর্বোচ্চ, ইরানের পরেই। এছাড়া জেদ্দা বিমানবন্দরের হজ টার্মিনালের নকশার জন্য বাংলাদেশি স্থপতি ও পুরকৌশলী এফ আর খান এই পুরস্কার জিতেছিলেন।
এর বাইরেও বাংলাদেশের স্থপতিরা কমনওয়েলথ অ্যাসোসিয়েশন অব আর্কিটেক্টস (সিএএ) অ্যাওয়ার্ডস, জেকে সিমেন্ট অ্যাওয়ার্ডস, ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব আর্কিটেক্টস (ইউআইএ) অ্যাওয়ার্ডস ও আরকএশিয়া অ্যাওয়ার্ডসসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পুরস্কার ও স্বীকৃতি পেয়েছেন নানা সময়ে।
সংখ্যার বিচারে এই অর্জন আরও বিস্ময়কর। বাংলাদেশ একটি ছোট দেশ, যার নিবন্ধিত স্থপতির সংখ্যা প্রায় ৫ হাজার—যেখানে ভারতে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার, পাকিস্তানে ৬ হাজার, যুক্তরাষ্ট্রে ১ লাখ ৩০ হাজার এবং যুক্তরাজ্যে ২৮ হাজার স্থপতি রয়েছেন। এই তুলনায় নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, বাংলাদেশ প্রতিবেশী ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার চেয়ে ভালো করেছে।
কেন এমন হলো—এই প্রশ্নের কোনো একক উত্তর নেই। এটি জিনগত কি না, প্রশিক্ষণ ও শিক্ষার ফল কি না, নাকি অনুরাগের বিষয়—কোনো নির্দিষ্ট একক কারণ চিহ্নিত করা কঠিন। দেশে ভালো স্থপতি তৈরির প্রেক্ষাপট নিয়ে কয়েকটি কারণ ভাবা গেলেও সেগুলোকে সমর্থন করার মতো সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ, উপাত্ত বা গবেষণা নেই; এগুলো দেশের স্থাপত্য সংস্কৃতি নিয়ে কিছু পর্যবেক্ষণ মাত্র।
এই ধারার শুরুতে রয়েছেন মজহারুল ইসলাম, যিনি এই দেশ ও অঞ্চলের আধুনিক স্থাপত্যের পথিকৃৎ। দেশবিভাগের পর থেকে ১৯৮০-র দশক পর্যন্ত নির্মিত তার বিশ্বমানের স্থাপত্য প্রকল্পের উদাহরণ প্রজন্মের পর প্রজন্মের সামনে রয়েছে—তিনি কেবল ভালো ভবনের দৃষ্টান্তই স্থাপন করেননি, উচ্চ নৈতিক মান ও পেশার প্রতি আনুগত্যের নিদর্শনও তৈরি করেছেন।
কারুপণ্যের এই নতুন স্বীকৃতি সেই দীর্ঘ ধারারই সর্বশেষ সংযোজন। একটি গ্রিন ফিল্ড কারখানার মতো শিল্পভবন যে বিশ্বের সেরা স্থাপত্যের তালিকায় জায়গা করে নিতে পারে, তা বাংলাদেশের স্থপতিদের নকশা-ভাবনার পরিপক্বতারই প্রমাণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।




