প্যারিসে বিক্ষোভ-সহিংসতার মূল্য দিচ্ছেন ছোট ব্যবসায়ীরা: লুটপাটে সর্বস্ব হারিয়ে কাঁদছেন দোকানিরা
ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে গত সপ্তাহান্তের বিক্ষোভ-সহিংসতা ও লুটপাটের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে ছোট ব্যবসায়ীদের। প্লাস দ্য লা রেপুবলিকের কাছের এলাকায় লুটপাট ও দাঙ্গার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা দোকানগুলো এখন ধ্বংসস্তূপের মতো দাঁড়িয়ে আছে।
মোবাইল ফোনের দোকানি হাসান রাশদুলের দোকানের জানালায় লাথি মেরে ভাঙা গর্তের চারপাশে ঝুলছে কাচের ধারালো টুকরো। ফোনে সিসিটিভির লাইভ চিত্র দেখতে দেখতে তিনি বলছিলেন, ‘আমি কাঁদছিলাম।’
তার দোকানের কাচের কাউন্টার ভেঙে চুরমার, মেঝেজুড়ে ছড়িয়ে ভাঙা কাচ। নতুন ও রিকন্ডিশন্ড মোবাইল ফোন, আইপ্যাড ও কম্পিউটারে ভরা শোকেসগুলো এখন খালি। হেডফোন, কেবল, ফোনের কভারসহ যেসব সরঞ্জাম দেয়ালে ঝুলছিল, সব লুট হয়ে গেছে।
৩২ বছর বয়সী রাশদুল বলেন, ‘এটা সত্যিই ভয়াবহ। আমাদের জন্য খুব, খুব কঠিন... এমনিতেই আমাদের মতো ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য সময়টা কঠিন। আমরা ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার জন্য নয়, শুধু টিকে থাকার জন্যই লড়ছি।’
রাশদুলের হিসাব অনুযায়ী, তিনি অন্তত ৭০ হাজার ইউরোর (প্রায় ৭৮ হাজার ৬০০ ডলার) মালামাল হারিয়েছেন। তার বীমায় চুরির ক্ষতি অন্তর্ভুক্ত না থাকায় এই ক্ষতিপূরণ তিনি পাবেন না।
তবে ফরাসি সরকার ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকর্নুর মতে, দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্ত ফ্রান্সজুড়ে প্রায় ৩ হাজার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কর্মীদের বেতন সরকার বহন করবে। ব্যবসাগুলোকে আবার মালামাল তুলতে সহায়তার জন্য একটি ‘বিশেষ সহায়তা তহবিল’ও ঘোষণা করা হয়েছে।
লেকর্নু দাঙ্গা ও লুটপাটের সঙ্গে জড়িতদের ধরতে ২০০ জনের বেশি তদন্তকারীকে কাজে লাগানোর নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু লুটেরারা দ্রুত 움직ছে—কিছু ব্যবসায়ী বলছেন, লুট হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাদের মালামাল অনলাইনে বিক্রির জন্য তোলা হয়েছে।
ডিজিটাল মন্ত্রী আন ল্য হেনাঁফ সামাজিক মাধ্যম এক্সে বলেছেন, ‘এই সপ্তাহান্তে চুরি যাওয়া পণ্য নির্দিষ্ট কিছু প্ল্যাটফর্মে বিক্রির জন্য দেওয়া হচ্ছে। আমরা আশা করি, এসব প্ল্যাটফর্ম বিলম্ব না করে সংশ্লিষ্ট তালিকাগুলো সরিয়ে ফেলবে।’
তিনি স্বরাষ্ট্র ও বিচার মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে ছয়টি প্ল্যাটফর্মের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ফ্রান্সের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বৈঠকে ভিন্টেড, অ্যামাজন, ইবে, ল্যবঁকোয়া, মেটা ও টিকটকের পাশাপাশি ফরাসি অনলাইন খুচরা সংগঠন ফেভাদকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। ল্য হেনাঁফ আরও বলেন, চুরির পণ্য বিক্রেতাদের বিচারের আওতায় আনতে প্ল্যাটফর্মগুলোকে রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সহযোগিতা করতে হবে।
রাশদুলের দোকানের আশপাশের ছোট মুদি দোকান, চশমার দোকান, ফোনের দোকান আর ক্যাফেগুলোও গত সপ্তাহান্তের সহিংসতার সাক্ষ্য বহন করছে। কিছু দোকান বোর্ড দিয়ে বন্ধ করে রাখা হয়েছে, আর যেখানে চুরির মতো কিছু বাকি নেই, সেগুলো অক্টোবরের স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ার মধ্যে খোলা ও অরক্ষিত পড়ে আছে।
তবু দুর্দশার মধ্যেও আশার আলো দেখছেন রাশদুল। তিনি বলেন, ‘এর আরেকটা দিকও আছে, ইতিবাচক দিক—এলাকার মানুষ, পাড়া-প্রতিবেশীরা।’ স্থানীয় গ্রাহকেরা সামাজিক মাধ্যমে দোকানিদের সাহায্যের জন্য আবেদন চালাচ্ছেন বলে জানান তিনি। ‘এসব মানুষই আবার চেষ্টা করার ইচ্ছা জাগায়,’ বলেন তিনি। ‘মানুষ আমাদের দোকান আবার গড়তে, কাজে ফিরতে আর এই পাড়ার সেবা আবার শুরু করতে সাহায্য করছে।’
কিন্তু পথটা সহজ হবে না। বাংলাদেশ থেকে ফ্রান্সে অভিবাসী হওয়া রাশদুলের এই ব্যবসা গড়তে সময় লেগেছে ১০ বছর। এখন তিনি নিজেকে গর্বিত ফরাসি নাগরিক বলেন—বিক্ষোভের অধিকারকে সম্মান করেন, কিন্তু তার মতো ব্যবসা আর ফ্রান্সের ওপর সহিংসতার প্রভাব নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন। তার কথায়, ‘আমি আবার গড়তে চাইলেও আগামী শনিবার আবার বিক্ষোভের ঘোষণা এসেছে। আমি জানি, আমরা গণতন্ত্রে আছি, বিক্ষোভের অধিকার আছে; কিন্তু সেটা যদি আবার লুটপাটে গিয়ে ঠেকে, তা ফ্রান্সের জন্য কঠিন এবং দেশটির আন্তর্জাতিক সুনামের জন্য ক্ষতিকর।’




