‘চুক্তি করার সময় হয়েছে’, অসলোতে আশার পরও জেলেনস্কিকে চাপ ট্রাম্পের, বললেন যুক্তরাষ্ট্র ‘কিছুই ফেরত পায়নি’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মঙ্গলবার বলেছেন, তিনি চান ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি রাশিয়ার সঙ্গে ‘একটি চুক্তি করুন’। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, কিয়েভকে দেওয়া সহায়তার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ‘কিছুই ফেরত পায়নি’।
হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা চাই জেলেনস্কি একটি চুক্তি করুন। তিনি চুক্তি করতে পারেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘দুই বছর আগে আমাদের ওভাল অফিসে যে ছোট্ট আলাপ হয়েছিল, তখনই তিনি চুক্তি করতে পারতেন’ — যার মাধ্যমে তিনি ২০২৫ সালের শুরুর দিকে দুই নেতার উত্তপ্ত বৈঠকের দিকেই ইঙ্গিত করেন। ট্রাম্পের ভাষায়, ‘তাঁকে চুক্তি করতে চাইতেই হবে, কারণ আমার মনে হয় না তাঁর জনগণ আর এটি সহ্য করবে।’
ট্রাম্পের এই মন্তব্য আসে জেলেনস্কি অসলোতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক করার কিছুক্ষণ পরেই। সেই প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে ছিলেন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ, যিনি বুধবার রাশিয়া সফরে গিয়ে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করার কথা।
নরওয়ের রাজধানীতে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্ডার স্টাব ও নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী ইয়োনাস গার স্তোরেও অংশ নেন। ট্রাম্পের জামাতা ও আরেক প্রধান দূত জ্যারেড কুশনার ভিডিও লিংকের মাধ্যমে বৈঠকে যোগ দেন। জেলেনস্কির সঙ্গে ছিলেন ইউক্রেনের গোয়েন্দা প্রধান রুস্তেম উমেরভ ও প্রভাবশালী আইনপ্রণেতা দাভিদ আরাখামিয়া।
বৈঠকের পর জেলেনস্কি তুলনামূলক ইতিবাচক সুরেই কথা বলেন। তিনি জানান, সম্প্রতি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে তাঁর গঠনমূলক আলোচনা হয়েছে এবং তিনি ট্রাম্প ও পুতিনকে নিয়ে ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের আহ্বান জানিয়েছেন। শক্তিশালী নিরাপত্তা নিশ্চয়তা ও জ্বালানি যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব নিয়েও অসলোতে আলোচনা হয়েছে বলে তিনি জানান।
যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগি নিয়ে ওঠা বিতর্কের প্রসঙ্গে জেলেনস্কি বলেন, তিনি ‘কৃতজ্ঞ’ যে ‘গোয়েন্দা তথ্য এখন কাজ করছে’। তাঁর ভাষায়, ‘আমি আগাম সতর্কবার্তার কথা বলছি, যা আমাদের জনগণের জন্য, শিশুদের জন্য, বড়দের জন্য, বেসামরিক মানুষের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আসছে কি না আমরা তখন শুনতে পাই।’ কিয়েভ এর আগে ওয়াশিংটন গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা তথ্য আটকে রেখেছে বলে অভিযোগ করেছিল, যা রুবিও ‘কলঙ্কজনক’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
সন্ধ্যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বার্তায় জেলেনস্কি লেখেন, ‘এটি গঠনমূলক ছিল, কারণ আমরা সবাই শান্তি চাই — ইউক্রেন, ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র। আগামীকাল কী হয়, দেখা যাক।’ স্টাব বলেন, শান্তির প্রস্তাবগুলোতে ‘প্রকৃত অগ্রগতি’ হয়েছে, যদিও তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি এবং ধৈর্য ধরতে হবে বলে সতর্ক করেন। স্তোরে জোর দিয়ে বলেন, যুদ্ধ শেষ করার যেকোনো আলোচনায় ইউরোপকে ‘টেবিলে থাকতেই হবে’।
অন্যদিকে রাশিয়ার অবস্থান এখনো অনমনীয়। পুতিন এখনো প্রকাশ্যে কিছু বলেননি, তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ আগেই বলেছেন, উইটকফ যা প্রস্তাব দেবেন তা ক্রেমলিন শুনবে, তবে ‘কোনো রাজনৈতিক ছাড়’ দেওয়ার প্রশ্ন বাতিল করে দিয়েছেন তিনি। জেলেনস্কি ও তাঁর ইউরোপীয় মিত্রদের মতে, অসলোতে যেসব প্রস্তাবে মতৈক্য হয়েছে, সেগুলোর জবাব দেওয়ার পালা এখন রাশিয়ার — বুধবার উইটকফ সেন্ট পিটার্সবার্গে পৌঁছালেই তা জানা যাবে।
দ্বিতীয় মেয়াদে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্প দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে জেলেনস্কির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ওঠানামার মধ্য দিয়ে গেছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তা আরও তিক্ত হয়েছে — ট্রাম্প পুতিনের সঙ্গে ডিজেল চুক্তি করেছেন এবং রাশিয়ার জ্বালানি খাতে ইউক্রেনের হামলার প্রভাব নিয়ে সমালোচনা করেছেন। এমনকি তিনি বলেছেন, ইউক্রেনের নতুন প্রেসিডেন্ট পাওয়ার সময় হয়েছে এবং অন্য কাউকে ইউক্রেনের পক্ষে আলোচনা করা উচিত।
এর আগে এই মাসে মায়ামিতে উইটকফ ও কুশনারের সঙ্গে ইউক্রেনীয় প্রতিনিধিদের বৈঠক হঠাৎ শেষ হয়ে গিয়েছিল, যখন তারা জানতে পারেন ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্য বাজারে ৩ লাখ টনের বেশি ডিজেল সরবরাহ করবে। জেলেনস্কি একে পুতিনের জন্য ‘জন্মদিনের উপহার’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। গত শুক্রবার ট্রাম্প রাশিয়ার ওপর বিস্তৃত নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার দুই দিন আগে তা মওকুফ করে দেন, যা কিয়েভের জন্য আরও উদ্বেগের কারণ হয়।
আলোচনার এই টানাপোড়েনের মধ্যেও মঙ্গলবার রাশিয়ার ড্রোন হামলা অব্যাহত ছিল। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এদিন অন্তত ১০ জন নিহত হয়েছেন — কিয়েভ ও রাজধানী অঞ্চলে চারজন, পূর্বাঞ্চলীয় দোনেৎস্ক অঞ্চলে চারজন এবং মধ্যাঞ্চলীয় শহর দিনিপ্রোতে দুজন। ২০২২ সালে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর মস্কো বর্তমানে ইউক্রেনের প্রায় ২০ শতাংশ ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করছে।
জেলেনস্কি স্টারলিংক স্যাটেলাইট সেবা ও মার্কিন প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের বিষয়েও ভালো ফলাফলের আশা প্রকাশ করেছেন। রুবিও, যিনি বর্তমানে ভারত সফরে রয়েছেন, সাংবাদিকদের বলেছেন, প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর এখনো না পৌঁছানোর খবর সত্য হতে পারে, তবে কিয়েভকে ইচ্ছাকৃতভাবে কিছু থেকে বঞ্চিত করা হয়নি। ফলে অসলোর আশাবাদের পরও ট্রাম্প ও জেলেনস্কি আবারও মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছেন বলেই মনে হচ্ছে; এখন সবার দৃষ্টি পুতিনের জবাবের দিকে।






