ফ্রান্সের সহিংসতাই আমেরিকার ভবিষ্যৎ, সতর্ক করলেন রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান কিথ সেলফ
ফ্রান্সজুড়ে ছড়িয়ে পড়া সহিংস বিক্ষোভ ও দাঙ্গার জন্য ব্যাপক অভিবাসনকে দায়ী করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের প্রভাবশালী এক রিপাবলিকান সদস্য। ইউরোপ নীতি দেখভালের দায়িত্বে থাকা এই শীর্ষ আইনপ্রণেতা সতর্ক করে বলেছেন, একই পরিণতি যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও অপেক্ষা করতে পারে।
টেক্সাসের রিপাবলিকান প্রতিনিধি কিথ সেলফ ফক্স নিউজ ডিজিটালকে বলেছেন, ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে চলা সহিংস বিক্ষোভ দেখে তিনি মোটেই অবাক হননি; বরং তার মতে, এই পরিস্থিতি অনেক আগে থেকেই তৈরি হচ্ছিল।
তিনি বলেন, 'তারা বছরের পর বছর ধরে এমনটা ঘটতে দিয়েছে, তাই এখন তারা যা বুনেছে তাই কাটছে।' তার ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রও নিজের ব্যাপক অভিবাসনের পরিণতি সামলানোর চেষ্টা করছে—ফ্রান্সের যা অনেক বছর আগেই করা উচিত ছিল।
কিথ সেলফ হাউস ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির ইউরোপবিষয়ক উপকমিটির চেয়ারম্যান। তিনি টেক্সাসের আরেক রিপাবলিকান প্রতিনিধি চিপ রয়ের সঙ্গে মিলে 'শরিয়া-মুক্ত আমেরিকা ককাস' নামের একটি গোষ্ঠীর সহপ্রতিষ্ঠাতাও।
ডেমোক্র্যাটরা এই গোষ্ঠীটিকে ইসলামবিদ্বেষী বলে সমালোচনা করেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্র কাউন্সিল অব মুসলিম অর্গানাইজেশনসের মতো সংগঠনও এর নিন্দা জানিয়েছে। তবে সেলফ নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেননি।
সেলফ যুক্তি দিয়েছেন, ফ্রান্সের দাঙ্গার পেছনে দেশটির বাড়তে থাকা মুসলিম জনসংখ্যা অন্তত আংশিকভাবে দায়ী। তার ভাষায়, ফ্রান্সে এখন মুসলিমদের হার প্রায় ৭ শতাংশ এবং বড় শহরগুলোতে তারা ঘনীভূত হওয়ায় সেটাই 'টিপিং পয়েন্ট' তৈরি করছে বলে তিনি দাবি করেন। ফ্রান্সের জাতীয় পরিসংখ্যান ইনস্টিটিউটের হিসাবে ইসলাম দেশটির ১৮ থেকে ৫৯ বছর বয়সীদের মধ্যে ক্যাথলিক ধর্মের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্ম।
ফ্রান্সের ধর্মনিরপেক্ষ মধ্যপন্থি সরকার অবশ্য এই অস্থিরতার জন্য উগ্র বামপন্থি গোষ্ঠীগুলোকে দায়ী করেছে। সরকারের মতে, জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয় ও ব্যয়বহুল শিক্ষাসহ নানা বিষয়ে উত্তেজনাকে এসব গোষ্ঠী আরও উসকে দিচ্ছে।
কয়েক দিনের সহিংসতায় দোকানপাট লুট হয়েছে এবং শতাব্দী প্রাচীন ভবনে আগুন ধরিয়ে দেওয়া ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এই সপ্তাহান্তে ফ্রান্সের নানা শহর ও জনপদে ৫ লাখের বেশি মানুষ রাস্তায় নেমেছিলেন বলে খবরে বলা হয়েছে।
ফরাসি কর্তৃপক্ষের হিসাবে, সারা দেশে ১ হাজার ৮০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের মধ্যে শুধু রাজধানী প্যারিসেই গ্রেপ্তার হয়েছেন ৮০০ জনের বেশি। প্রতিবাদকে কেন্দ্র করে প্যারিসের লুভর জাদুঘর সোমবার ঘোষণা দিয়েছে, আপাতত এটি বন্ধ থাকবে।
সেলফ ফ্রান্সের পরিস্থিতিকে প্রকাশ্য 'গৃহযুদ্ধ' বলে আখ্যা দিয়েছেন এবং বলেছেন, দেশটির সামরিক বাহিনীর এগিয়ে আসা উচিত—যদিও তারা তা করবে কি না, সে বিষয়ে তিনি হতাশাবাদী। তার দাবি, সেনাবাহিনী না নামলে বড় শহরগুলোতে ফ্রান্স তার সংস্কৃতি হারানোর খুব কাছাকাছি পৌঁছে যাবে।
প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাকরোঁর পদত্যাগ করা উচিত কি না—এমন প্রশ্নে সেলফ বলেন, সেটা ম্যাকরোঁর সিদ্ধান্ত; তবে তার মতে, পদত্যাগ ফ্রান্সের জন্য সম্ভবত ভালোই হবে। একই সঙ্গে তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই বিশৃঙ্খলা যেন যুক্তরাষ্ট্র-ফরাসি সম্পর্কে বিরূপ প্রভাব না ফেলে।
সেলফের প্রস্তাব, বিক্ষোভ সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে যুক্তরাষ্ট্রের উচিত ফ্রান্সকে সাহায্য করা—মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তিসহ যা যা সম্ভব। তিনি পরিষ্কার করেছেন, আমেরিকানদের সরাসরি পাঠানোর কথা তিনি বলছেন না। তার ভাষায়, ফ্রান্স এখনো যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বড় মিত্র; এই সময়ে তাকে ত্যাগ করা ঠিক হবে না।
এদিকে, ফ্রান্সের এই ঘটনাপ্রবাহ মার্কিন রাজনীতিতেও প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। হাউস স্পিকার মাইক জনসন ফ্রান্সের সহিংসতাকে দেশের ভেতরে থাকা আমেরিকানদের জন্য 'ভয়ংকর সতর্কবার্তা' বলে বর্ণনা করেছেন। সেলফের মূল বক্তব্যও একই সুরের—তার কথায়, 'এটি আমেরিকার জন্য একটি শিক্ষা। আমরা ফ্রান্সে, সত্যি বলতে যুক্তরাজ্যেও, আমেরিকার ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছি।'






