টুপটুপ রিসোর্টের আগুনে একসঙ্গে স্ত্রী-সন্তানসহ ছয় স্বজনকে হারালেন নূর আলম, বাকরুদ্ধ পরিবার
কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর পাটুয়ারটেক সৈকতসংলগ্ন টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে স্ত্রী, একমাত্র সন্তান, শ্যালক ও তিন শ্যালিকাকে হারিয়েছেন বরিশালের উজিরপুর উপজেলার বড়াকোঠা ইউনিয়নের গাজিরপাড় গ্রামের নূর আলম।
পুলিশ ও আদালত সূত্রে জানা গেছে, গত শনিবার সকালে টুপটুপ রিসোর্টে আগুন লাগে। পরে সেখান থেকে ১০ জনের পোড়া মরদেহ উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স।
ওই দিন রাত ১১টার দিকে অবহেলাজনিত কারণে মৃত্যুর অভিযোগে উখিয়া থানার উপপরিদর্শক আশীষ সূত্রধর বাদী হয়ে মামলা করেন। এতে চারজনের নাম উল্লেখ করে ১৯ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়।
অফিসের জরুরি কাজে একদিন আগে কক্সবাজার থেকে চুয়াডাঙ্গায় ফিরে আসায় প্রাণে বেঁচে গেলেও মুহূর্তে নূর আলমের জীবনে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। তিনি বেসরকারি ওষুধ কোম্পানি ড্রাগ ইন্টারন্যাশনালের জ্যেষ্ঠ বিপণন কর্মকর্তা হিসেবে চুয়াডাঙ্গায় কর্মরত রয়েছেন।
চাকরির সুবাদে প্রায় আট বছর ধরে তিনি চুয়াডাঙ্গা শহরের দক্ষিণ হাসপাতালপাড়ায় স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে ভাড়া বাসায় বসবাস করছেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, তাঁর স্ত্রী ফারিয়া কবির বেশ কিছুদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন। অসুস্থতার মধ্যেও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটাতে তাঁরা কক্সবাজারে বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন।
বুধবার স্ত্রী ফারিয়া কবির ও পাঁচ বছর বয়সের একমাত্র ছেলে ফাইজান নূরকে নিয়ে চুয়াডাঙ্গা থেকে ঢাকায় যান নূর আলম। পরের দিন বৃহস্পতিবার শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের সঙ্গে তাঁরা কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হন।
কক্সবাজারে পৌঁছানোর পর অফিসের জরুরি কাজ থাকায় শুক্রবার নূর আলম একাই চুয়াডাঙ্গায় ফিরে আসেন। কিন্তু পরের দিন শনিবার সকালে গণমাধ্যমে কক্সবাজারের ইনানীর টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের খবর দেখে তিনি স্বজনদের খোঁজ নিতে শুরু করেন। একপর্যায়ে জানতে পারেন, ভয়াবহ ওই অগ্নিকাণ্ডে নিহত ছয়জনই তাঁর পরিবারের সদস্য।
নিহতরা হলেন নূর আলমের স্ত্রী ফারিয়া কবির (৩৩), তাঁদের পাঁচ বছর বয়সের ছেলে ফাইজান নূর, শ্যালক নাসির উদ্দিন (২৫) এবং তিন শ্যালিকা ইসরাত জাহান মালিহা (৩০), লায়লা জাহান নাবিলা (২৭) ও মিলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩)। এ ঘটনায় আরও কয়েকজন হতাহত হয়েছেন।
দগ্ধদের মধ্যে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক শিহাব উদ্দীন ও তাঁর স্ত্রী নাফিজা নেওয়াজ খান, ইসমাইল হোসেন মাসুদ ও তাঁর স্ত্রী মেহেরুন নেছা, মান্নান এবং সামিদা রয়েছেন। ইসমাইল হোসেন ও তাঁর স্ত্রী মেহেরুন নেছা নিহত ফারিয়া কবিরের মামা-মামি। তাঁদের বাড়ি চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার দক্ষিণ ঠেটালিয়া গ্রামে।
নূর আলমের বাবা মোহাম্মদ আলী রাঢ়ী জানিয়েছেন, ছেলে নূর আলম বিয়ে করার পর স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে কখনো তাঁদের উজিরপুরের গ্রামের বাড়িতে আসেননি। নূর আলমের শ্বশুরবাড়ি পটুয়াখালীর তালতলীতে হলেও তাঁরা ঢাকার বনশ্রী এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। তিনি বলেন, পুত্রবধূ, নাতি এবং ছেলের শ্যালক-শ্যালিকাসহ পরিবারের ছয়জনকে হারানোর খবর তাঁদের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক। সবার লাশ ঢাকায় দাফন করার বিষয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে প্রাথমিকভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ডিএনএ পরীক্ষার শেষে পরিচয় শনাক্ত হওয়ার পর লাশ হস্তান্তর করা হবে। এর জন্য তিন থেকে চার সপ্তাহ সময় লেগে যেতে পারে। একসঙ্গে স্ত্রী, একমাত্র সন্তান, শ্যালক ও তিন শ্যালিকাকে হারিয়ে নূর আলম এখন বাকরুদ্ধ, কারও সঙ্গে তেমন কোনো কথা বলছেন না। যে ভ্রমণ ছিল পরিবারের সঙ্গে আনন্দঘন সময় কাটানোর আয়োজন, সেটিই এখন পরিণত হয়েছে জীবনের সবচেয়ে বড় শোকে।



