সরকারই আওয়ামী লীগকে ফেরার পথ করে দিচ্ছে, জরুরি সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ পরওয়ারের
সরকার বিরোধী দলের আন্দোলন উপেক্ষা করে অরাজকতা ও অস্থিতিশীলতা তৈরির মাধ্যমে ইচ্ছা করে আওয়ামী লীগকে ফেরার পথ করে দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তার ভাষ্যে, সরকারের দুর্নীতি ও দলীয়করণ নিয়ে কথা বললেই বিরোধী দলকে রাষ্ট্রের বিরোধী হিসেবে আখ্যা দেওয়া হচ্ছে।
মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর মগবাজারে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সাম্প্রতিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। সংবাদ সম্মেলনে সরকারের সাত মাসের কার্যক্রম নিয়ে একগুচ্ছ অভিযোগ তুলে ধরেন তিনি।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “সরকারের সাত মাসে সমন্বয়হীনতা এবং দায় চাপানোর চেষ্টা হাস্যকর। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী জুলাইকে ধারণ করে না—বিএনপির এমন অভিযোগও হাস্যকর। জামায়াতে ইসলামীই জুলাইকে ধারণ করে। সরকার জুলাইকে ধারণ না করায় গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করছে না। তারা সাংবিধানিক সব প্রতিষ্ঠানে দলীয় লোক বসাচ্ছে।”
তিনি বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করে সাংবিধানিক পদ, সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে ছাত্রদল ও যুবদলের লোকদের বসানো হচ্ছে। তার দাবি, জামায়াতসহ ১১ দল জুলাইকে ধারণ করে এবং এ কারণে গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নের দাবিতে তারা রাজপথে আন্দোলন করছেন। বিএনপি জুলাইকে ধারণ করে না বলেই গণভোটকে অস্বীকার ও বাতিল করেছে এবং রায় বাস্তবায়নে টালবাহানা করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
জুলাই চেতনার বাইরে সরকার পদক্ষেপ নিচ্ছে উল্লেখ করে গোলাম পরওয়ার বলেন, সম্প্রতি সরকারি কর্মকমিশনে (পিএসসি) হাত দিয়েছে সরকার। সেখানে চা খাওয়ার দাওয়াত দিয়ে পিএসসির চেয়ারম্যানসহ অন্যান্য সদস্যদের পদত্যাগের কথা বলা হচ্ছে। অথচ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা এই দলীয়করণের বিরুদ্ধে চব্বিশের আন্দোলনে নেমে এসেছিলেন বলে তিনি মনে করিয়ে দেন।
গোলাম পরওয়ার বলেন, জুলাইয়ে আহতদের চিকিৎসার জন্য জামায়াতের আমির পাশে ছিলেন। সারা বিশ্বে জামায়াতে ইসলামী নিজস্ব উদ্যোগে জুলাই শহীদদের স্মৃতি তুলে ধরা ও সংরক্ষণের জন্য বাংলা, ইংরেজি ও আরবি—তিনটি ভাষায় বই প্রকাশ করেছে। সরকারের কোটি কোটি টাকার তহবিল থাকার পরও এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেই। জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তাদের বেতন হচ্ছে না এবং তারা জামায়াতের কাছে অভিযোগ করছেন বলেও তিনি জানান।
বিএনপি তাদের নোট অব ডিসেন্টের ওপর অনড় থাকতে গিয়ে রাষ্ট্র সংস্কারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে, যা ফ্যাসিবাদী বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষ্যে, তারা নিজেদের মতো বিশেষ কমিটি করে সংবিধান সংস্কার না করে সংশোধনের পথে যাচ্ছে; সংবিধান সংস্কার না করে যেভাবে রাখা হচ্ছে, তাতে যে প্রধানমন্ত্রীই আসবেন, তিনিই ফ্যাসিবাদী হবেন।
সংবিধান সংশোধনে বিরোধী দলের সহযোগিতা লাগবে কেন—এমন প্রশ্ন তুলে গোলাম পরওয়ার বলেন, “জনগণ গণভোটে প্রায় ৭০ ভাগ ভোট দিয়ে সংবিধান সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে। সরকার সংস্কার না করে জনগণকে পাশ কাটিয়ে সংবিধান সংশোধন করতে চায়। একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কারের প্রশ্নে সরকার অসত্য তথ্য দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করছে।” এর তীব্র নিন্দা জানান তিনি।
ওসমানী উদ্যানে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিরোধীদলীয় নেতার যোগদানের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের জবাবে গোলাম পরওয়ার বলেন, ওই অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্রে বিরোধীদলীয় নেতার নাম উল্লেখ না করা অসম্মানজনক। অথচ প্রতিমন্ত্রীদের নাম কার্ডে উল্লেখ করা হয়েছে। রুলস অব প্রেসিডেন্স অনুযায়ী তিনি একজন পূর্ণমন্ত্রীর পদমর্যাদার অধিকারী; আমন্ত্রণপত্রে যথাযথ সম্মান না দেওয়ার কারণেই তিনি অনুষ্ঠানে যাননি। প্রধানমন্ত্রী অসত্য ও হাস্যকর তথ্য তুলে ধরেছেন বলে অভিযোগ করে তার নিন্দা জানান তিনি।
সরকার ফ্যাসিবাদের পথে হাঁটছে উল্লেখ করে গোলাম পরওয়ার বলেন, “বাংলাদেশের মানুষ আওয়ামী লীগকে দেখে ফ্যাসিবাদ শিখেছে। কিন্তু রিজভী সাহেব সাত মাসেই তা ভুলে গেছেন। ফ্যাসিস্ট চিনতে হলে জনগণের কাছে ফিরে যেতে হবে। চাঁদাবাজি, লুটতরাজ, সরকারি পদে দলীয় লোক বসানোই ফ্যাসিবাদের পথ। জনগণের রায় উপেক্ষা করা ফ্যাসিবাদের পথ। গণভোটের রায় না মানা ফ্যাসিবাদের পথ।” বিএনপি নিজেদের দলের জুলাইয়ে আহতদের জিজ্ঞেস করলেই ফ্যাসিবাদের পথ চিনতে পারবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামী কোনো জোট করেনি। জামায়াতের প্রস্তুত করা কেয়ারটেকার সরকারের ফর্মুলা বাস্তবায়নের দাবিতে জাতীয় পার্টি, বাম দলসহ অনেক দলের সঙ্গে তারা আন্দোলন করেছেন। তার দাবি, বিএনপির গণবিরোধী অবস্থানের কারণেই ১৯৯৬ সালে দলটি ক্ষমতায় আসতে পারেনি এবং বিএনপির কারণেই আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসেছিল; বিএনপি তখন মাগুরা মার্কা নির্বাচন করেছিল।
সভা-সমাবেশ ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে বাধার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, সভা-সমাবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না, আমীর হামজা এমপিকে ওয়াজ মাহফিল করতে দেওয়া হচ্ছে না; লাখো ভোটে নির্বাচিত এমপিকে ঠেকাতে না পেরে ওয়াজ মাহফিলের অনুমতি বাতিল করা হয়েছে। রাজশাহীর সম্মেলন বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়ে তিনি সরকারকে আওয়ামী লীগের মতো ফ্যাসিবাদের পথ থেকে ফিরে আসার আহ্বান জানান।
একটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে মাদরাসাগুলোর ম্যানেজিং কমিটি ভেঙে দেওয়ার সমালোচনা করে তিনি বলেন, সরকার ফ্যাসিবাদী চিন্তা থেকে দলীয় লোকদের বসাতে কমিটি ভেঙে দিয়েছে; গত ১৭ বছর শেখ হাসিনা এ পথেই হেঁটেছেন, পরে দিল্লি চলে গেছেন। সরকারের বরাদ্দ থেকে বিরোধী দলের এমপিদের বঞ্চিত করা এবং অনির্বাচিত নারী এমপিদের নির্বাচিত এমপিদের ওপর বসানোরও তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি ও মাওলানা আবদুল হালিম, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মো. আব্দুর রব, অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ ও মোবারক হোসাইন, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের সহকারী সেক্রেটারি মাহফুজুর রহমান এবং মহানগরী উত্তরের প্রচার ও মিডিয়া সেক্রেটারি আতাউর রহমান সরকার। ভবিষ্যতে বিরোধীদলীয় নেতার বিষয়ে আর কোনো অসত্য তথ্য জাতির সামনে তুলে না ধরতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বক্তব্য শেষ করেন গোলাম পরওয়ার।





