নতুন চাকরির প্রথম ছুটিতে বাড়ি ফেরা হলো না আনোয়ারের, নাটোরে ১৪ প্রাণ কেড়ে নেওয়া দুর্ঘটনায় সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি
বরিশালে একটি প্রকল্পে নতুন চাকরি পেয়েছিলেন আনোয়ার হোসেন (৩০)। পূজার ছুটি পেয়ে ফিরছিলেন বাড়ি। নতুন চাকরি পাওয়ার আনন্দ নিয়ে বাড়ি ফেরার পথেই থেমে গেল তার জীবন—মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) ভোররাতে নাটোরের বড়াইগ্রামে বাস ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ১৪ জনের একজন তিনি। একই দুর্ঘটনা খতিয়ে দেখতে সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে নাটোর জেলা প্রশাসন।
নিহত আনোয়ার হোসেন রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার চাঁইপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। তার মরদেহের অপেক্ষায় আছেন স্বজনেরা। মরদেহ আনতে পরিবারের কয়েকজন সদস্য ইতোমধ্যে নাটোরে অবস্থান করছেন। বাড়ির পাশের পারিবারিক কবরস্থানে তাকে সমাহিত করার জন্য কবর খনন করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা।
সরেজমিনে আনোয়ারের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পরিবারের সদস্যরা শোকে স্তব্ধ। সকালে তাদের ঘুম ভেঙেছে আনোয়ারের মৃত্যুর খবরে। একই উপজেলার কোনোপাড়া গ্রামে বাবার বাড়িতে ছিলেন আনোয়ারের স্ত্রী ফাতেমা বিবি। সেখান থেকেই স্বজনরা মৃত্যুর খবর পান। সকালেই ফাতেমা দুই সন্তানকে নিয়ে স্বামীর বাড়িতে পৌঁছান। স্বামীর মৃত্যুর খবরে ঠিকমতো কথা বলতে পারছিলেন না তিনি।
আনোয়ারের ভাতিজা মিজানুর রহমান জানান, আনোয়ার ঢাকায় থাকতেন এবং একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। কিছুদিন আগে বরিশালে একটি প্রকল্পে নতুন চাকরি পান। সেখানে যোগ দিয়ে প্রথম ছুটিতে বাড়ি ফিরছিলেন। নাটোর-রাজশাহী মহাসড়কের পুঠিয়ায় বাস থেকে নামার কথা ছিল তার। সেখান থেকে বাড়িতে পৌঁছাবেন বলে মোবাইলে পরিবারকে জানিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেই বাড়ি ফেরা আর হলো না।
মিজানুর রহমান বলেন, তার এক দাদাসহ কয়েকজন আনোয়ারের মরদেহ আনতে নাটোরে গেছেন। মরদেহ পেলে বাড়ির পাশে পারিবারিক কবরস্থানে চাচাকে দাফন করা হবে। এ জন্য কবর খোঁড়াও চলছে। বাগমারা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) তৌহিদুল ইসলাম বলেন, দুর্ঘটনায় আনোয়ারের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর তার পরিবারকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তরের জন্য থানা-পুলিশ বনপাড়া হাইওয়ে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হয়েছে।
পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা যায়, ভোররাতে কুয়াকাটা থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জগামী আরপি পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে বিপরীত দিক থেকে আসা বালুবোঝাই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয় বড়াইগ্রাম উপজেলার বনপাড়ায়। এতে ঘটনাস্থলেই ১০ জন নিহত হন। পরে হাসপাতালে আরও চারজনের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় আহত অন্তত ২০ জনকে বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়।
দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে আটজনের পরিচয় শনাক্ত হয়েছে। তারা হলেন—শরীয়তপুরের জাজিরার সামাদ ফকির (৭০), সোহাগ হোসেন (৩০), জুয়েল রানা (৪০), শালাল মোল্লা (৪৫), শাহিন হোসেন (২৫), রাজশাহীর গোদাগাড়ীর বাসচালক সোহেল রানা (৪০), বাগমারার আনোয়ার হক (৩০) এবং পটুয়াখালীর তাছফিয়া খাতুন (৮)। নিহতদের তালিকায় আট বছরের শিশু তাছফিয়ার নাম এই দুর্ঘটনার মর্মান্তিকতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
দুর্ঘটনাকবলিত বাসের যাত্রী আব্দুস সালাম অভিযোগ করে বলেন, বাসটিতে অতিরিক্ত যাত্রী বহন করা হচ্ছিল এবং বাসটি দ্রুতগতিতে চালানো হচ্ছিল। অতিরিক্ত যাত্রী বহন ও দ্রুতগতির কারণে এমন দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে তিনি দাবি করেন। এই অভিযোগ এখন তদন্তের অন্যতম বিষয়।
এদিকে দুর্ঘটনা খতিয়ে দেখতে সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে নাটোর জেলা প্রশাসন। এই কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আবুল হায়াতকে। মঙ্গলবার এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন নাটোর জেলা প্রশাসক মোছা. সুমনী আক্তার।
জেলা প্রশাসক জানান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আবুল হায়াতকে আহ্বায়ক করে সাত সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি দুর্ঘটনার কারণ ও সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো খতিয়ে দেখবে। তদন্তের ভিত্তিতে পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন জাতীয় সংসদের হুইপ অ্যাডভোকেট এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, নাটোরের জেলা প্রশাসক মোছা. সুমনী আক্তার ও পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শরীফুল হক। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের এই পরিদর্শনের পরই তদন্ত কমিটি গঠনের ঘোষণা আসে।
আনোয়ারের মতো প্রতিটি নিহতের পেছনেই রয়েছে একটি পরিবার, একটি অসমাপ্ত গল্প। নতুন চাকরি, প্রথম ছুটি আর পূজার আনন্দ নিয়ে বাড়ি ফেরার যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা শেষ হয়েছে মরদেহ হয়ে ফেরায়। স্বজনদের এখন একটাই অপেক্ষা—মরদেহ বাড়ি পৌঁছানো এবং শেষ বিদায়ের প্রস্তুতি।
এখন সবার চোখ তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের দিকে। অতিরিক্ত যাত্রী ও দ্রুতগতির অভিযোগসহ দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ কমিটি কী খুঁজে পায় এবং সেই ভিত্তিতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তার ওপর নির্ভর করবে এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে বাস্তব কোনো পদক্ষেপ আসে কি না।




