উদ্বোধনের পাঁচ মাসেও চালু হয়নি বগুড়ার কোটি টাকার আধুনিক কসাইখানা, পশুবর্জ্যের দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ বাসিন্দারা
উন্নত বিশ্বের আদলে নির্মিত আধুনিক কসাইখানা—স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের সহায়তায় প্রতি ঘণ্টায় জবাই ও মাংস প্রক্রিয়াজাত করা যাবে ১৫টি গরু এবং ৩০টি ছাগল বা ভেড়া, পশু জবাই হবে ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী, থাকবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও বায়োগ্যাস উৎপাদনের ব্যবস্থাও। কিন্তু উদ্বোধনের পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও জনবল সংকটে চালু হয়নি বগুড়ার এই অত্যাধুনিক কসাইখানাটি।
ফলে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত স্থাপনাটি পড়ে আছে অব্যবহৃত। অন্যদিকে বগুড়া নগরীর বিভিন্ন স্থানে পশু জবাই ও বর্জ্য ফেলার কারণে পরিবেশদূষণ বাড়ছে।
বগুড়া-নওগাঁ আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে গোদারপাড়া বাজার এলাকায় পশুবর্জ্য ফেলার কারণে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। এতে অতিষ্ঠ স্থানীয় বাসিন্দা, পথচারী ও বাজারে আসা ক্রেতা-বিক্রেতারা।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আধুনিক কসাইখানাটি চালু হলে স্বাস্থ্যসম্মত মাংস সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি পশুবর্জ্যের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা সম্ভব হবে। তবে প্রয়োজনীয় জনবল, পরিচালন ব্যবস্থা ও ব্যবসায়ীদের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত না হওয়ায় এখনো শুরু হয়নি কার্যক্রম।
বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে লাইভস্টক অ্যান্ড ডেইরি ডেভেলপমেন্ট (এলডিডিপি) প্রকল্পের আওতায় বগুড়া নগরীর জয়পুরপাড়ায় ৫০ শতক জমির ওপর নির্মাণ করা হয় আধুনিক কসাইখানাটি। গত ১৭ মে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু এর উদ্বোধন করেন।
এদিকে গোদারপাড়া বাজার এলাকায় পশুবর্জ্য ফেলার কারণে দীর্ঘদিন ধরে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। দুর্গন্ধের কারণে বাজারের ক্রেতা-বিক্রেতা ও পথচারীদেরও ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। বিশেষ করে শিশু ও স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের চলাচলে সমস্যা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
এলাকার বাসিন্দা আব্দুল মালেক বলেন, পশুবর্জ্যের দুর্গন্ধে তারা দীর্ঘদিন ধরে চরম দুর্ভোগের মধ্যে আছেন। এই সড়ক দিয়ে যারা চলাচল করেন, তারা অল্প সময়ের জন্যও দুর্গন্ধ সহ্য করতে পারেন না, অথচ তাদের দিনের পর দিন এই পরিবেশে বসবাস করতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, জয়পুরপাড়ায় আধুনিক কসাইখানা নির্মাণ করা হয়েছে। সেখানে পশু জবাই ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করা হলে গোদারপাড়ার পরিবেশের উন্নতি হতো। বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ সমস্যা নিয়ে সংবাদ প্রকাশ হলেও কার্যকর সমাধান হয়নি। তিনি চান, দ্রুত পশুবর্জ্য অপসারণ ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় সিটি করপোরেশন কার্যকর পদক্ষেপ নিক।
বগুড়ার নারী উদ্যোক্তা শ্যামলী আক্তার বলেন, আধুনিক কসাইখানাটি চালু হলে রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সাধারণ ভোক্তা সবাই উপকৃত হবেন। প্রচলিত পদ্ধতিতে পশু জবাইয়ের ক্ষেত্রে সব সময় স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয় না। এতে পরিবেশদূষণের পাশাপাশি মাংসের স্বাস্থ্যগত মান নিয়েও উদ্বেগ থাকে।
তিনি বলেন, আধুনিক কসাইখানা চালু হলে স্বাস্থ্যবিধি মেনে মাংস প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব হবে। সরকারি অর্থায়নে অনেক সময় আধুনিক যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামো নির্মাণ করা হলেও চালুর অভাবে সেগুলো নষ্ট হয়ে যায়। তিনি চান, এই কসাইখানার ক্ষেত্রে যেন এমনটা না হয়—দ্রুত এর কার্যক্রম শুরু করা হোক।
বগুড়া সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ সাঈদ আলী বলেন, আধুনিক প্রযুক্তিতে নির্মিত কসাইখানাটি পরিচালনার মতো দক্ষ জনবল বর্তমানে সিটি করপোরেশনের নেই। এ কারণে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে এটি পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, কসাইখানাটি পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় শর্তাবলি প্রস্তুত করা হচ্ছে। দ্রুত দরপত্র আহ্বান করা হবে। এ ধরনের স্থাপনা পরিচালনায় অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ করা হচ্ছে। তাদের লক্ষ্য, যত দ্রুত সম্ভব কসাইখানাটি চালু করা। বর্তমানে নগরীতে যেভাবে খোলা জায়গায় পশু জবাই ও মাংস বিক্রি হচ্ছে, তা স্বাস্থ্যসম্মত নয়; আধুনিক কসাইখানার মাধ্যমে নগরবাসীর কাছে নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর মাংস পৌঁছে দেওয়াই লক্ষ্য, আর প্রাথমিক পর্যায়ে মুনাফার চেয়ে কসাইখানাটি সচল করাকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তবে এই কর্মকর্তা জানান, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সহায়তায় নগরীর কসাই ও মাংস ব্যবসায়ীদের তালিকা তৈরির কাজ চলছে। তাদের নতুন ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে প্রয়োজনীয় প্রণোদনা দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। পাশাপাশি মাংস পরিবহনের সমস্যা এড়াতে চিলার ভ্যানের ব্যবস্থা করার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। কসাইখানা চালু হলে পশু জবাই ছাড়াও মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পরিবহনসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কাজে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে বলেও তিনি জানান।
হালাল পদ্ধতি ও বায়োগ্যাস নিয়ে বগুড়া জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ডা. কাজী আশরাফুল ইসলাম বলেন, আধুনিক কসাইখানায় মেশিনের মাধ্যমে পশু জবাই করা হবে—এমন ধারণা সঠিক নয়। এখানে ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী প্রশিক্ষিত ব্যক্তির মাধ্যমে পশু জবাই করা হবে; পরবর্তী কয়েকটি ধাপে আধুনিক যন্ত্র ব্যবহার করে মাংস প্রক্রিয়াজাত করা হবে। প্রচলিত পদ্ধতিতে জবাইয়ের পর দীর্ঘ সময় ঝুলিয়ে রেখে মাংস বিক্রি করা হয়, এতে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে; আধুনিক কসাইখানায় জবাইয়ের আগে স্বাস্থ্য পরীক্ষা, জবাইয়ের উপযোগিতা যাচাই এবং মাংসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সুযোগ থাকবে।
তিনি আরও জানান, এলডিডিপি প্রকল্পের আওতায় নির্মিত স্থাপনাটি ইতিমধ্যে সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়া প্রতিষ্ঠানকে প্রয়োজনীয় কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে, আর জবাইয়ের আগে পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং মাংস নিরাপদ কি না, তা তদারক করবে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। কসাইখানায় পশুর মল প্রক্রিয়াজাত করে বায়োগ্যাস উৎপাদনের পরিকল্পনাও রয়েছে, যা নবায়নযোগ্য জ্বালানি তৈরির পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বগুড়া নগরীতে প্রায় ৪৯২ জন কসাই রয়েছেন—তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আধুনিক পদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এখন সবার অপেক্ষা দরপত্র ও তৃতীয় পক্ষ নির্বাচনের প্রক্রিয়া শেষে কসাইখানাটি সত্যিই চালু হওয়ার দিকে।




