বন্দিতালিকায় নাম ছিল, সাজার তথ্য ছিল না: দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড নিয়ে সৌদির কাছে ব্যাখ্যা চাইল ঢাকা
সৌদি আরবের পাঠানো বন্দিতালিকায় দুই বাংলাদেশির নাম ছিল, তাঁদের বিরুদ্ধে অপরাধের উল্লেখও ছিল—কিন্তু কী সাজা দেওয়া হয়েছে, তা জানানো হয়নি। পরে দুজনেরই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। মৃত্যুদণ্ডের তথ্য বাংলাদেশকে কেন জানানো হয়নি, সৌদি আরবের কাছে সেই প্রশ্ন তুলেছে ঢাকা।
সোমবার জেদ্দায় সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক ফরিদ বিন সাদ আল সেহেরির সঙ্গে বৈঠকে প্রশ্নটি তোলেন বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল মো. সাখাওয়াত হোসেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, সৌদি কর্মকর্তা এ প্রশ্নের সদুত্তর দিতে পারেননি।
একই দিন দুই বাংলাদেশির মামলার বিবরণ ও বিচারিক প্রক্রিয়ার বিস্তারিত চেয়ে সৌদি আরবকে আবার কূটনৈতিক পত্র দিয়েছে বাংলাদেশ। সাখাওয়াত হোসেন বৈঠক ও নতুন কূটনৈতিক পত্র দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন, তবে আলোচনার বিস্তারিত জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন।
মন্ত্রণালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, নতুন পত্রে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুজনের মামলার বিস্তারিত বিবরণ, বিচারিক প্রক্রিয়ায় নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ এবং দণ্ডিত হওয়ার পর তাঁরা আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগ আদৌ পেয়েছিলেন কি না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে।
গত ১৪ অক্টোবর সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে সৌদি প্রেস এজেন্সি দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর জানায়। এর পরদিন ১৫ অক্টোবর জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট বিস্তারিত জানাতে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে একটি কূটনৈতিক পত্র দেয়। ১৮ অক্টোবর ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূতের কাছেও সেই পত্র আবার দেওয়া হয়।
সোমবারের বৈঠকে সৌদি পক্ষ জানায়, ২০২৩ সালের আগস্টে গ্রেপ্তারের পর যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে প্রথমে নিম্ন আদালত দুই আসামিকে দণ্ড দেন। পরে আপিল আদালতে ১৩ জন বিচারকের প্যানেল তাঁদের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। রায় অনুসরণ করে নারী ও পুরুষের জন্য নির্ধারিত পৃথক সেলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। যত দ্রুত সম্ভব বিস্তারিত জানানোর অনুরোধও জানানো হয় বৈঠকে, যা আন্তরিক পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়।
এ সময় কনসাল জেনারেল তালিকার অসংগতির বিষয়টি তোলেন। বিচার যদি যথাযথ প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হয়ে থাকে, তবে বাংলাদেশকে দেওয়া তালিকায় নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারকে কী দণ্ড দেওয়া হয়েছে, তা ঊহ্য রাখা হলো কেন—এই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর সৌদি কূটনীতিক দিতে পারেননি।
কনসাল জেনারেল বলেন, তালিকা থেকে জেদ্দা মিশন যদি জানতে পারত যে দুজনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, তাহলে তাঁদের সুরক্ষায় পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ পাওয়া যেত। সেই সুযোগ তথ্য গোপন থাকায় নষ্ট হয়েছে—এটাই ঢাকার বড় আপত্তি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, গত ৩০ সেপ্টেম্বর জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেটে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দণ্ডিত ব্যক্তিদের একটি তালিকা পাঠায়। তাতে নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারের নাম ছিল। তাঁদের বাড়ি যথাক্রমে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও টাঙ্গাইলে। ২০২২ সালের শেষ দিকে সৌদি আরবে গিয়ে আল মাজাল কোম্পানিতে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন দুজনই।
নথি অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১ আগস্ট নজরুল ইসলাম এবং পরদিন ২ আগস্ট সুইটি আক্তারকে আটক করা হয়। ৩০ সেপ্টেম্বরের তালিকায় নজরুলের বিষয়ে বলা হয়, জেদ্দা সংশোধনাগারে থাকা অবস্থায় তাঁকে সাইবার অপরাধে দণ্ড দেওয়া হয়েছে—কিন্তু কখন ও কী দণ্ড, তা উল্লেখ ছিল না। সুইটির অবস্থান জেদ্দা মহিলা কারাগারে উল্লেখ করে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অপরাধের কথা বলা হলেও সাজার বিবরণ ছিল না।
১৮ অক্টোবর জেদ্দা থেকে ঢাকায় পাঠানো বাংলাদেশ মিশনের বার্তায় বলা হয়, সাইবার কিংবা ব্যভিচারের অপরাধে এর আগে কোনো বাংলাদেশি নাগরিককে সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার নজির নেই। দেশটির পশ্চিমাঞ্চলের কারাগারগুলোতে চারিত্রিক স্খলনের মামলায় ৩০৬ জন বাংলাদেশি আটক আছেন; তাঁদের মধ্যে ১৪৭ জনের বিরুদ্ধে এক মাস থেকে সর্বোচ্চ ১৫ বছর পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদের সাজা হয়েছে। সাইবার অপরাধে মক্কায় আরও তিন বাংলাদেশিকে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
সোমবার দুপুরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, অভিযোগ এনে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা বাংলাদেশের জন্য হতাশার। সাংবাদিকদের প্রশ্নে তিনি স্বীকার করেন, এ ঘটনায় তথ্য আদান-প্রদান ও কূটনৈতিক যোগাযোগ প্রক্রিয়ায় ঘাটতি ছিল। সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ঘটনার বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও তথ্য চাওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। এখন ঢাকার অপেক্ষা সৌদি আরবের জবাবের দিকে।



