…English
বড়লেখা টুডে লোগো
সব বড় ঘটনার খবর — নিজের ভাষায়, প্রতি ঘণ্টায়
প্রচ্ছদ › জাতীয় › খবর
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন — আবদুল কুদ্দুস, চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী, ৫ নং দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়ন পরিষদ
জাতীয়

এলএনজি আমদানির খরচে গ্যাস খাতে পাঁচ মাসে ঘাটতি প্রায় ২৭ হাজার কোটি টাকা, বাড়ছে ভর্তুকির চাপ

নিজস্ব প্রতিবেদক

আন্তর্জাতিক বাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি আর দেশীয় উৎপাদন কমে যাওয়ায় দেশের গ্যাস খাতে আর্থিক সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। প্রতি ঘনমিটার এলএনজি আমদানিতে এখন খরচ পড়ছে প্রায় ১১৭ টাকা। দেশীয় গ্যাসের সঙ্গে মিশিয়ে সরবরাহের পর গড় ক্রয়মূল্য দাঁড়াচ্ছে ৫২ টাকা ১৮ পয়সা, অথচ গ্যাস বিক্রি হচ্ছে গড়ে মাত্র ২৩ টাকা ৯০ পয়সা দরে — এই ব্যবধানই ঘাটতির মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পেট্রোবাংলার হিসাবে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে — জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত — ঘাটতি হয়েছে ১৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। অক্টোবর মাসে আরও ৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঘাটতি হয়েছে, আর নভেম্বর মাসে এই অঙ্ক ৬ হাজার ১৫৫ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। সব মিলিয়ে অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসেই ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২৬ হাজার ৯৫৫ কোটি টাকা। এরই মধ্যে ১৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ভর্তুকি ছাড় করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

আগের অর্থবছরের সঙ্গে তুলনা করলে সংকটের গভীরতা আরও স্পষ্ট হয়। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গ্যাস খাতে ১৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঘাটতির বিপরীতে সরকার ১৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছিল। অথচ চলতি অর্থবছরে জ্বালানি খাতে ভর্তুকি বরাদ্দ মাত্র ৬ হাজার কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি সামাল দিতে বাড়তি অর্থের সংস্থান নিয়ে বড় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান গণমাধ্যমকে বলেন, ইরান যুদ্ধের কারণে পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করেছে। স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনতে গেলে প্রতি কার্গোতে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে। কাতার ও ওমান থেকে সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) ভিত্তিতে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় লোকসান আরও বাড়ছে। চলতি মাসে একটি জাহাজ হরমুজ প্রণালি পার হতে সক্ষম হলে সেটি দ্রুত সংগ্রহ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

ঘাটতি পূরণের বিষয়ে চেয়ারম্যান বলেন, সরকার এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। জ্বালানি একটি অতি প্রয়োজনীয় পণ্য, তাই সরবরাহ বন্ধ রাখার সুযোগ নেই। তাঁর দেওয়া হিসাবে, যুদ্ধের আগে এক কার্গো এলএনজি কিনতে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা লাগত; বর্তমানে তা কিনতে সর্বোচ্চ ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয় হচ্ছে। আগে প্রতি এমএমবিটিইউ গ্যাস ১০ ডলারে পাওয়া গেলেও এখন দাম উঠেছে ২২ থেকে ২৮ ডলারে।

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে গ্যাসের গড় ক্রয়মূল্য ছিল প্রতি ঘনমিটার ২৭ টাকা ৬৪ পয়সা। এপ্রিল থেকে জুন সময়ে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৫ টাকা ৭৯ পয়সায়। ওই সময়ে গড় বিক্রয়মূল্য ২৩ টাকা ৬৩ পয়সা থাকায় প্রতি ঘনমিটারে ঘাটতি হয় ২১ টাকা ৮২ পয়সা।

ঘাটতি কমাতে একপর্যায়ে দাম বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল। বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের দাম প্রতি ঘনমিটার ১৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫ টাকা এবং যানবাহনে ব্যবহৃত সিএনজির দাম ৪৩ টাকা থেকে ৬৫ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছিল পেট্রোবাংলা। তবে এফএসআরইউতে অগ্নিকাণ্ডের কারণে দেশে গ্যাস সংকট চলার মধ্যে দাম বাড়ানোর উদ্যোগ সমালোচনার মুখে পড়লে প্রক্রিয়াটি আপাতত স্থগিত করা হয়।

দেশীয় গ্যাসের তুলনায় আমদানিকৃত গ্যাসের ব্যয় যে কতটা বেশি, তা উৎসভিত্তিক দামে স্পষ্ট। সিলেট গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি ও বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি থেকে প্রতি ঘনমিটার গ্যাস কেনা হয় ১ টাকায়, বাপেক্স থেকে ৪ টাকায়। শেভরন বাংলাদেশের গ্যাসের দাম প্রায় ১২ টাকা এবং টাল্লোর ক্ষেত্রে প্রায় ১০ টাকা। অন্যদিকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে কাতার থেকে আমদানি করা এলএনজির দাম ছিল প্রতি ঘনমিটার প্রায় ৪৬ টাকা এবং ওমানের গ্যাসের দাম প্রায় ৪৪ টাকা।

বর্তমানে গ্যাস সরবরাহের প্রায় ৩০ শতাংশ আমদানির ওপর নির্ভরশীল। দেশীয় গ্যাসের গড় ক্রয়মূল্য প্রতি ঘনমিটার ৬ টাকা ৭ পয়সা হলেও আমদানিকৃত গ্যাস যুক্ত হওয়ায় সামগ্রিক গড় মূল্য বেড়ে ৫২ টাকা ১৮ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। খাতসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে আমদানির অংশ ৭০ শতাংশে পৌঁছালে ঘাটতি আরও বাড়বে। তাঁদের মতে, দেশীয় মজুত কমে আসার সময় অনুসন্ধান ও নতুন কূপ খননে জোর না দিয়ে আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ানোই বর্তমান সংকটের অন্যতম কারণ।

দেশীয় গ্যাস ব্যবহারের অবকাঠামো নির্মাণেও ধীরগতির চিত্র রয়েছে। ভোলার উদ্বৃত্ত গ্যাস মূল ভূখণ্ডে আনতে ১ হাজার ৯৩১ কোটি টাকার ভোলা-বরিশাল পাইপলাইন প্রকল্প আটকে থাকলেও প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে মহেশখালী-বাখরাবাদ সমান্তরাল পাইপলাইন প্রকল্প এগিয়ে চলছে। ফেনী-বাখরাবাদ অংশের ঠিকাদার নিয়োগের কাজও প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

নতুন কূপ খননের পরিকল্পনাও প্রশাসনিক জটিলতায় আটকে আছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন পর্যায়ে প্রায় ১৯টি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) আটকে রয়েছে, আর বর্তমান সরকারের সময়ে এখন পর্যন্ত মাত্র একটি ডিপিপি অনুমোদিত হয়েছে। গ্যাস উন্নয়ন তহবিলের (জিডিএফ) অর্থায়নে নেওয়া প্রকল্পও প্রশাসনিক জটিলতায় আটকে আছে। পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, তিনি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে গিয়ে আলোচনা করেছেন এবং শিগগিরই দুটি ডিপিপি অনুমোদনের আশা করছেন।

সরবরাহের চিত্রও সংকটের গভীরতা বোঝায়। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দৈনিক প্রায় ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে কমবেশি ২ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে আসে প্রায় ১ হাজার ৬২০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং আমদানিকৃত এলএনজি থেকে ৯৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনেই দৈনিক প্রায় ২ হাজার ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন। এ ছাড়া তিতাস গ্যাসের আওতায় ৩৭৯টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিপরীতে ৩৮০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের প্রতিশ্রুত লোড থাকলেও প্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োজনীয় সরবরাহ পাচ্ছে না।

একসময় দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে দৈনিক প্রায় ২ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হতো; বর্তমানে তা কমে প্রায় ১ হাজার ৬২৪ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমেছে। সবচেয়ে বড় গ্যাসক্ষেত্র বিবিয়ানার উৎপাদনও দৈনিক প্রায় ১ হাজার ৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে কমে ৭৩১ মিলিয়ন ঘনফুটে দাঁড়িয়েছে — এখনো দেশের মোট গ্যাস সরবরাহের প্রায় ৪৫ দশমিক ৫ শতাংশ আসে এই ক্ষেত্র থেকেই। সব মিলিয়ে খাতসংশ্লিষ্টদের মত, ভর্তুকির পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, নতুন কূপ খনন এবং ভোলার মতো সম্ভাবনাময় উৎসের গ্যাস ব্যবহারে কার্যকর উদ্যোগ না নিলে আমদানিনির্ভরতা ও আর্থিক ঘাটতি আরও বাড়বে — এখন সরকারের সিদ্ধান্তের দিকেই তাকিয়ে আছে পুরো খাত।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন — জাকির হোসেন, সম্ভাব্য ইউপি সদস্য পদপ্রার্থী, ৭ নং ওয়ার্ড, ৫ নং দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়ন

জাতীয় বিভাগের আরও খবর