ফ্রান্সে বিক্ষোভ-সহিংসতার পর পরিচ্ছন্নতা অভিযান, সামাজিক মাধ্যম বন্ধের প্রস্তাব আতালের, ‘নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল পুলিশ’
সপ্তাহান্তের ব্যাপক বিক্ষোভ ও সহিংসতার পর সোমবার ফ্রান্সজুড়ে বড় ধরনের পরিচ্ছন্নতা অভিযান চলছে। উত্তরে লিল থেকে দক্ষিণে মার্সেই এবং পূর্বে স্ট্রাসবুর্গ থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমে বোর্দো পর্যন্ত শহরগুলোতে রাস্তা থেকে সহিংসতার ক্ষতচিহ্ন সরানোর কাজ চলছে পুরোদমে।
শনিবার সারা দেশে লাখ লাখ বিক্ষোভকারী রাস্তায় নামেন। শিক্ষার আরও ভালো পরিবেশ, বেশি শিক্ষক ও বেশি বরাদ্দের দাবিতে কয়েক সপ্তাহ ধরে স্কুল অবরোধ করে আসা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ট্রেড ইউনিয়ন ও সাধারণ মানুষ যোগ দেন জীবনযাত্রার ব্যয়ের প্রতিবাদে। অনেকেই শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ করলেও দেশজুড়ে চরম সহিংসতার দৃশ্যও দেখা গেছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, এই অশান্তির মধ্যে প্রায় ২ হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সোমবার ফরাসি ও আন্তর্জাতিক সংবাদপত্রগুলো এই বিভাজনমূলক দাঙ্গা ও তার পরের পরিস্থিতি নিয়ে ‘লজ্জা’, ‘ক্ষোভ’ ও ‘বিশৃঙ্খলা’র মতো শিরোনামে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ সোমবার স্বীকার করেছেন, সপ্তাহান্তে দেশের নানা শহরে সহিংস বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লে কিছু শহরে পুলিশ ‘নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল’। সরকারের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি সামলানোর ধরন নিয়ে এই স্বীকারোক্তি বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে সামনে এসেছে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী গ্যাব্রিয়েল আতালের প্রস্তাব। দাঙ্গা থামাতে সরকারকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রবেশাধিকার বেছে বেছে বন্ধ করার ক্ষমতা দেওয়ার আহ্বান আবারও জানিয়েছেন তিনি।
ফরাসি রেডিও স্টেশন আরটিএলকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আতাল বলেন, ‘ঘরে থাকা তরুণরা দেখে তাদের বন্ধুরা লুটপাট করতে বেরিয়েছে, মনে হয় তারা পার পেয়ে যাচ্ছে; সামাজিক মাধ্যমে সেসব দেখে তারাও বেরিয়ে পড়ে।’ সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী এখন প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
তবে তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, এ ধরনের ব্যবস্থা হতে হবে ‘সাময়িক’ এবং ‘শুধু দাঙ্গা চলমান এলাকাতেই সীমাবদ্ধ’। প্রস্তাবটি সামনে এলেও এটি বিচারিক পর্যালোচনায় টিকবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
এর নজিরও বিতর্কিত। ২০২৪ সালে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে আতালের সরকার ফ্রান্সের বৈদেশিক অঞ্চল নিউ ক্যালেডোনিয়ায় ব্যাপক বিক্ষোভের মধ্যে টিকটকের প্রবেশাধিকার বন্ধ করেছিল। কিন্তু ফ্রান্সের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক আদালত রায় দেন, ওই স্থগিতাদেশ ছিল ‘অধিকার ও স্বাধীনতার ওপর অসমঞ্জস হস্তক্ষেপ’।
এ ছাড়া গত গ্রীষ্মে ফ্রান্সের সাংবিধানিক পরিষদ ১৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক মাধ্যম নিষিদ্ধ করার একটি বিল আটকে দেয়; পরিষদের মতে, ওই আইন নাবালকদের মতপ্রকাশ ও যোগাযোগের স্বাধীনতায় অসমঞ্জসভাবে হস্তক্ষেপ করত।
ইন্টারনেটে এ ধরনের বিধিনিষেধ সাধারণত চীন, ইরান, রাশিয়া এবং সম্প্রতি ভারতের মতো দেশগুলোর সঙ্গে যুক্ত। এসব দেশের কোনো কোনোটিতে নির্দিষ্ট সামাজিক মাধ্যম প্ল্যাটফর্মে স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, আবার প্রতিবাদ আন্দোলনের সময় ইন্টারনেট প্রবেশাধিকার পর্যন্ত সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ার নজিরও আছে ইরান ও ভারতে।
সব মিলিয়ে সপ্তাহান্তের অশান্তি ফ্রান্সের সামনে দুটি প্রশ্ন তুলে দিয়েছে — একদিকে জীবনযাত্রার ব্যয় ও শিক্ষার দাবিতে রাস্তায় নামা মানুষের ক্ষোভ, অন্যদিকে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রের ক্ষমতার সীমা। পরিচ্ছন্নতা অভিযানে রাস্তা সাফ হলেও এই বিতর্ক যে সহজে থামছে না, তা আতালের প্রস্তাব ঘিরে তর্কেই স্পষ্ট।




