মজুরি বোর্ড ঘিরে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার দাবি গার্মেন্টস ফেডারেশনের
তৈরি পোশাকশিল্পে মজুরি বোর্ড পুনর্গঠন ও মজুরি বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টার অভিযোগ করেছে গার্মেন্টস ফেডারেশন ঐক্য পরিষদ। এ ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। সোমবার সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এই দাবি জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির আহ্বায়ক মির্জা আল শামীম লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন। সেই বক্তব্যেই মজুরি বোর্ড নিয়ে সরকারের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানানো এবং একই সঙ্গে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির অভিযোগ — দুটি বিষয়ই একসঙ্গে তুলে ধরা হয়।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে শ্রম আইনে সংশোধন এনে প্রতি পাঁচ বছরের পরিবর্তে তিন বছর পরপর মজুরি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শ্রমিকদের স্বার্থে সরকারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে গার্মেন্টস ফেডারেশন ঐক্য পরিষদ। বক্তব্যে আরও উল্লেখ করা হয়, শ্রম মন্ত্রণালয় ২০২৬ সালের অক্টোবরের মধ্যেই মজুরি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সংগঠনটির অভিযোগ, মজুরি বোর্ড পুনর্গঠন ও মজুরি বৃদ্ধির দাবিকে কেন্দ্র করে একটি মহল দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির ষড়যন্ত্র করছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ-সমর্থিত কয়েকটি নিবন্ধিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন এই তৎপরতায় জড়িত বলে দাবি সংগঠনটির। এটি সংগঠনটির নিজস্ব অভিযোগ, যার বিষয়ে অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্য এই প্রতিবেদনের উপাদানে নেই।
ঐক্য পরিষদের ভাষ্য, ওই সংগঠনগুলো পোশাক কারখানায় অসন্তোষ উসকে দেওয়া এবং কারখানা বন্ধের পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছে। মজুরি নিয়ে আলোচনার প্রক্রিয়া চলমান থাকা অবস্থায় কারখানা পর্যায়ে অস্থিরতা তৈরি হলে শ্রমিক ও মালিক — দুই পক্ষেরই ক্ষতি হতে পারে বলে তারা মনে করে।
লিখিত বক্তব্যে গত ১২ অক্টোবর ঢাকার উত্তরায় শ্রমিক পরিচয়ে বহিরাগত ব্যক্তিদের লাঠিসোঁটা নিয়ে সড়ক অবরোধের ঘটনা তুলে ধরা হয়। বিভিন্ন কারখানা থেকে শ্রমিকদের বের করে এনে অবরোধে অংশ নিতে বাধ্য করা, সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখানো এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলার অভিযোগও করা হয়।
গার্মেন্টস ফেডারেশন ঐক্য পরিষদ বলেছে, মজুরি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের আগে এ ধরনের সহিংসতা শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নির্ধারণের প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। এ পরিস্থিতি দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলেও দাবি সংগঠনটির।
সংগঠনটি সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানায়। তাদের অবস্থান হলো, মজুরি বোর্ডের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়াকে সুযোগ না দিয়ে সহিংস পথে চাপ সৃষ্টি করা শ্রমিকদের স্বার্থের অনুকূল নয়।
লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, দেশের পোশাকশিল্পে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক কর্মরত। শিল্পটির স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। বিপুল এই কর্মসংস্থানের কারণেই মজুরি বোর্ডের প্রতিটি সিদ্ধান্ত জাতীয় অর্থনীতির জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ।
ঐক্য পরিষদ শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে বিভিন্ন সময়ে আরও কয়েকটি দাবিও জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মাতৃত্বকালীন ছুটি ছয় মাস করা, শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ গড়ে তোলা, শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক কলোনি স্থাপন এবং হাসপাতাল নির্মাণ। এসব দাবি মজুরির বাইরেও শ্রমিক কল্যাণের বিস্তৃত চিত্র তুলে ধরে।
মজুরি বোর্ড তিন বছর পরপর গঠনের সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে শ্রমিকদের মজুরি পর্যালোচনার ব্যবধান কমবে। তবে বোর্ড গঠন, প্রতিনিধিত্ব ও সুপারিশ চূড়ান্ত হওয়ার প্রক্রিয়ায় সব পক্ষের অংশগ্রহণ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশই এখন মূল চ্যালেঞ্জ।
এখন দেখার বিষয়, অক্টোবরের মধ্যে মজুরি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্ত কীভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং ঐক্য পরিষদের তোলা অভিযোগের বিষয়ে কর্তৃপক্ষ কোনো পদক্ষেপ নেয় কি না। পোশাকশিল্পের স্থিতিশীলতা ও ৪০ লাখ শ্রমিকের জীবনমানের প্রশ্নে এই প্রক্রিয়ার ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।




