জুলাইকে ধারণ করে না বিরোধী দল, স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধনে অনুপস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষোভ
বিএনপি একাত্তরের মতো জুলাইকেও ধারণ করে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, সরকার জুলাইয়ে আহতদের চিকিৎসা ও পরিবারের সদস্যদের নানাভাবে সহযোগিতা করছে। সোমবার সকালে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে রাজধানীর ওসমানী উদ্যানে ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’ উদ্বোধনের অনুষ্ঠানে তিনি বিরোধী দলের অনুপস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
প্রধানমন্ত্রী সোমবার সকাল ১০টায় অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছান। পরে শহীদ আবু সাঈদের বাবা মো. মকবুল হোসেন, মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধের বাবা মোস্তাফিজুর রহমান, শাহারিয়ার খাঁন আনাসের মা সানজিদা খান দীপ্তি এবং ওয়াসিম আকরামের বাবা মোহাম্মদ শফিউল আলমকে সঙ্গে নিয়ে তিনি স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধন করেন।
একই সঙ্গে তিনি আধুনিকায়নকৃত ওসমানী উদ্যানেরও উদ্বোধন করেন। উদ্বোধন শেষে প্রধানমন্ত্রী স্মৃতিস্তম্ভ প্রাঙ্গণে একটি গাছের চারা রোপণ করেন, পরে উদ্যান প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখেন এবং উদ্যানে স্থাপিত গ্রন্থাগার পরিদর্শন করেন।
বর্তমান বিরোধী দল শুধু বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা করছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তারা অবশ্যই সরকারের বিরোধিতা করবে, তবে তা হওয়া উচিত গঠনমূলক। তিনি অভিযোগ করেন, বিরোধী দল জুলাইকে ধারণ করে না।
তাই আমন্ত্রণ পেয়েও জুলাই স্মৃতিস্তম্ভের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দেননি বিরোধীদলীয় নেতা— প্রধানমন্ত্রীর এই অভিযোগই অনুষ্ঠানের বক্তব্যের সবচেয়ে আলোচিত অংশ হয়ে ওঠে।
তিনি বলেন, তাদের যদি আমাদের সঙ্গে একই মঞ্চে বসায় আপত্তি থাকে, চাইলে তো শহীদ পরিবারের সঙ্গেও বসতে পারতেন। অথচ তারা ভোট দেওয়ার কারণেই তো আমরা সরকারে, আর তারা বিরোধী দলে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচনের আগে নিশ্চয়ই বর্তমান বিরোধী দলও জনগণের কাছে গিয়েছে, আমরাও গিয়েছি। জনগণই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আগামী পাঁচ বছর কারা রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন। সে হিসেবে তারা হয়তো বিএনপিকে সরকারে বসিয়েছে, আবার বিরোধী দলকেও সেভাবে সমর্থন দিয়েছে।
তিনি বলেন, আজকের অনুষ্ঠানে না এসে বিরোধী দল শহীদ পরিবারগুলোকেও অবজ্ঞা করেছে। শহীদ পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে আয়োজিত এই উদ্বোধনে বিরোধী দলের অনুপস্থিতিকে তিনি এভাবেই ব্যাখ্যা করেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী আবদুল মঈন খান, প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণ এবং রাজধানীর নাগরিক পরিবেশ উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রকল্প দুটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণে নির্মাণ করা হয়েছে ৯০ ফুট উঁচু ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’।
প্রায় এক একর জায়গাজুড়ে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভটির গায়ে লেজার কাটিংয়ের মাধ্যমে খোদাই করা হয়েছে ৮৩৪ জন শহীদের নাম। সামনে স্থাপন করা হয়েছে ২০টি প্রতীকী সমাধিফলক।
স্মৃতিস্তম্ভের বাইরের দিকে ১৬৩ ফুট দীর্ঘ ও সাড়ে ৪ ফুট উঁচু এবং ভেতরে ১৭১ ফুট দীর্ঘ ও সাড়ে ৭ ফুট উঁচু রিলিফ ভাস্কর্য রয়েছে। এতে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০-এর গণআন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানসহ বাংলাদেশের ধারাবাহিক আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে।
রাজধানীর পুরান ও নতুন ঢাকার সংযোগস্থলে অবস্থিত ২৩ একর আয়তনের ঐতিহাসিক ওসমানী উদ্যানও আধুনিকায়ন করা হয়েছে। প্রকল্পটির আওতায় উদ্যানটিকে সবুজ, নিরাপদ ও আধুনিক নাগরিক বিনোদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে।
আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে পুরোনো জলাশয় সংস্কারের পাশাপাশি পাঁচটি নতুন জলাশয় নির্মাণ করা হয়েছে। বিদ্যমান গাছপালা সংরক্ষণ করে নতুন বৃক্ষরোপণ ও সবুজ দ্বীপ তৈরি করা হয়েছে। উদ্যানটিতে প্রায় ৩ দশমিক ১ কিলোমিটার হাঁটার পথ, ব্যায়ামাগার, প্যাগোডা, গণশৌচাগার, পার্কিং ও জলাশয়ের ঘাট নির্মাণ করা হয়েছে। এ ছাড়া ৫০ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার বৃষ্টির পানি সংরক্ষণব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
দুই স্তরে সাজানো উদ্যানটির সড়ক থেকে দুই মিটার উঁচুতে দ্রুত চলাচলের পথ রয়েছে। স্মৃতিস্তম্ভ ও উদ্যান উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে জুলাইয়ের স্মৃতি সংরক্ষণের আনুষ্ঠানিক অধ্যায় শুরু হলেও, অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক বক্তব্য— বিশেষ করে বিরোধী দলের অনুপস্থিতি নিয়ে তার মন্তব্য— দিনের আলোচনায় প্রধান হয়ে উঠেছে।




