‘ইনফ্লুয়েন্সার নয়’: হোটেল-রেস্তোরাঁ ও দর্শনীয় স্থানে ফটোশুটে বাড়ছে নিষেধাজ্ঞা
ছুটিতে গিয়ে কোনো সুন্দর জায়গায় দাঁড়ালেই আজকাল চোখে পড়ে ফোন উঁচিয়ে, কখনো রিং লাইট নিয়ে পোজ দেওয়া মানুষ। কেউ বড় অনুসারীসমৃদ্ধ ইনফ্লুয়েন্সার, কেউ আবার অতি উৎসাহী ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারী। কিন্তু হোটেল আর দর্শনীয় স্থানগুলো তাদের ভিড়ে অতিষ্ঠ হয়ে এখন ছবি তোলায় নিষেধাজ্ঞা বসাতে শুরু করেছে।
ফ্রান্সের অঁতিবের পাঁচতারকা হোটেল দ্যু কাপ-এডেন-রক — গ্ল্যামারাস অতিথি, কোত দাজুরের দৃশ্য আর অসাধারণ ইনফিনিটি পুলের জন্য পরিচিত — ফটোশুটের বিরুদ্ধে নিয়ম করেছে: আগে থেকে অনুমতি ছাড়া আর ফটোশুট করা যাবে না।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এর পেছনে কারণ হলো অনেকে দুপুরের খাবারের রিজার্ভেশন নিয়ে ব্যাগভর্তি পোশাক আর গয়না নিয়ে আসছিলেন। খেতে বসার বদলে তাঁরা সময়টা কাজে লাগাচ্ছিলেন নানা পোশাকে নিজেদের ফটোশুটে, যাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করার মতো ছবি তৈরি হয়।
কম গ্ল্যামারাস জায়গাগুলোও কড়াকড়ি করছে। চেশায়ারের খামার-দোকান ‘দ্য হলিস’ — ‘লাভ আইল্যান্ড’ তারকা মলি-মে হেগের পোস্টের কল্যাণে কনটেন্ট নির্মাতাদের জনপ্রিয় ঠিকানা — সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ছবি তোলা ও ভিডিও করা নিষিদ্ধ করেছে।
লন্ডনের রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী জেরেমি কিং — সিম্পসন’স ইন দ্য স্ট্র্যান্ড ও দ্য পার্কের মতো প্রতিষ্ঠানের পেছনের মানুষ — এ বছর ‘ইভনিং স্ট্যান্ডার্ড’-এ লিখেছেন, ‘ইনফ্লুয়েন্সারদের দৌরাত্ম্যে আমি ক্লান্ত — যথেষ্ট হয়েছে।’
যুক্তরাষ্ট্রে কেপ কডের কাছের দ্বীপ নানটাকেটের একটি দোকান এ বছর ভাইরাল হয় ‘নো ইনফ্লুয়েন্সার্স’ লেখা সাইনবোর্ডের জন্য। ভারমন্টের পমফ্রেট শহর শরতের পাতার সামনে ইনফ্লুয়েন্সারদের ছবি তোলা নিষিদ্ধ করেছে। জাপানের ফুজিকাওয়াগুচিকোতে ফুজি পর্বতের সামনে একটি কনভেনিয়েন্স স্টোরের সামনে ছবি তোলা ঠেকাতে পর্দা টানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানগুলোর যুক্তির একটি বড় অংশ হলো গোপনীয়তা ও ব্যক্তিগত পরিসর। বিশেষ করে দামি হোটেলগুলোতে অতিথিরা যে গোপনীয়তা প্রত্যাশা করেন, ফটোশুটের ভিড় তা নষ্ট করে। হোটেল দ্যু কাপ-এডেন-রকের ব্যবস্থাপক সোফি ভোলান্ট বলেন, অতিথিরা রেস্তোরাঁ ও বারে মানুষজন পছন্দ করলেও তাঁদের গ্রীষ্মের বাড়িটি ব্যক্তিগত থাকুক সেটাও চান; তাই সমাধান ভাবতে হয়েছে।
বোমিয়ে হোটেল গ্রুপের প্রধান বিপণন কর্মকর্তা আনা ফেদু বলেন, তাঁর গ্রুপ কখনো কখনো ইনফ্লুয়েন্সারদের সঙ্গে কাজ করে নিজেদের বিলাসবহুল হোটেলের প্রচারের কনটেন্ট তৈরি করে — মার্সেইয়ের কাছে ছবির মতো পুলের জন্য প্রিয় লে রোশ রুজসহ। গ্রুপটির ছবি তোলা নিয়ে নির্দিষ্ট নিয়ম নেই, তবে মূল উদ্দেশ্যটি তারা মনে রাখে।
ফেদুর ভাষায়, ‘আমরা আতিথেয়তার ব্যবসায় আছি, ফটো স্টুডিও চালানোর ব্যবসায় নয়। সারা বিশ্ব থেকে মানুষ আসে কোনো হোটেলকে অনন্য করে তোলা পরিবেশ, পরিসর আর অনুভূতি উপভোগ করতে। সেটি রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব।’
হোটেল-রেস্তোরাঁয় ছবি তোলার নিয়মগুলো মুহূর্তটি ধরে রাখার বদলে মুহূর্তে থাকার দিকের একটি বড় প্রবণতার প্রতিফলন। যুব সংস্কৃতি সংস্থা লিভিটির প্রতিষ্ঠাতা অ্যালেক্স গোট এটিকে তুলনা করেছেন ক্লাবগুলোর ফোনের ক্যামেরায় স্টিকার লাগিয়ে দেওয়ার সঙ্গে — তারা জানান দিতে চায়, তারা গান ভালোবাসা মানুষদের জন্য।
ইনফ্লুয়েন্সারদের প্রতি বিরূপ মনোভাবের পেছনে একটি ভুল ধারণাও কাজ করে — তাঁরা এই কনটেন্ট থেকে ভালো অর্থ পান। কখনো বোমিয়ের মতো হোটেলের সঙ্গে বিনামূল্যে কক্ষের বিনিময়ে পোস্ট হয়, কিন্তু ক্রিয়েটর ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা ইনফ্লুয়েন্সার নিকোল ওক্রানের মতে, বেশির ভাগই দর্শকদের জন্য বিনামূল্যে কনটেন্ট তৈরি করেন, ব্র্যান্ডের দৃষ্টি আকর্ষণের আশায়।
‘ইনফ্লুয়েন্সার ক্রিপ’ বইয়ের লেখক সোফি বিশপ বলেন, জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে ইনফ্লুয়েন্সার সংস্কৃতি সব সময়ই নেতিবাচকভাবে দেখা হয়েছে; এটি মিডিয়ার একটি অত্যন্ত নারীকেন্দ্রিক ধরন, যা প্রচার সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত — ফলে এর সঙ্গে অভিজাততন্ত্র আর লিঙ্গবৈষম্যের প্রশ্নও জড়িয়ে যায়।
সারা বিশ্বে প্রতিদিন ৫৪০ কোটির বেশি মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ওক্রান আশা করেন, ছবি তোলার নিয়মগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতি আরও ভারসাম্যপূর্ণ মনোভাব তৈরি করবে — প্রতিটি জায়গা সর্বজনীন ভোগের জন্য নয়, প্রতিটি অভিজ্ঞতাকে কনটেন্টে রূপ দেওয়ারও দরকার নেই। একজন নির্মাতা হিসেবে তাঁর কাছে এটা সবার জন্য স্বাস্থ্যকর বার্তা।
ফেদু মনে করেন, মূল কথা হলো ভারসাম্য — সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্টের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা, আবার অতিথিদের প্রশান্ত অভিজ্ঞতাও অটুট রাখা। তাঁর মতে, ইনফ্লুয়েন্সাররা সাধারণত শান্ত সময় বেছে নেন শুটিংয়ের জন্য, যাতে অন্যদের বিরক্ত না করে জায়গাটি ধারণ করা যায়; তবে অতিথির অভিজ্ঞতাই সব সময় সবার আগে।




