১৯১ শিশু হত্যার মামলায় রায়ের মুখে কেনিয়ার অনশন ধর্মগুরু ম্যাকেঞ্জি
কেনিয়ার একটি আদালত আলোচিত এক গণহত্যা মামলায় রায় দিতে যাচ্ছে। প্রলয়বাদী ধর্মগুরু পল ম্যাকেঞ্জি ও তাঁর ২৯ অনুসারীর বিরুদ্ধে ১৯১ শিশুকে হত্যার অভিযোগ রয়েছে। এই প্রথমবারের মতো ধর্মগুরু ম্যাকেঞ্জি হত্যার সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগে রায়ের মুখোমুখি হচ্ছেন।
প্রসিকিউটরদের ভাষ্য অনুযায়ী, ম্যাকেঞ্জি তাঁর সর্বশেষ শিকারদের মৃত্যুর দিকে প্রলুব্ধ করেছিলেন কারাগারের কক্ষ থেকে পাঠানো চিঠির মাধ্যমে। তাঁর ধর্মসম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা শিশুদের অনশন করে মরতে বাধ্য করেছিল, যাতে তারা ‘যিশুর সঙ্গে মিলিত’ হতে পারে। তাঁর প্রলয়বাদী মতবাদে শিক্ষা ছিল নিষিদ্ধ এবং আধুনিক চিকিৎসাকে ‘শয়তানি’ হিসেবে গণ্য করা হতো।
ম্যাকেঞ্জি ও অন্য ২৯ জন সবাই হত্যার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁদের দাবি, কাউকে জোর করে মরতে বাধ্য করা হয়নি। ম্যাকেঞ্জির সাবেক নিরাপত্তাপ্রধান এনোস আমানিয়া ঙ্গালাকে প্রথমে অভিযুক্ত করা হলেও পরে তিনি দরখাস্ত চুক্তির মাধ্যমে প্রসিকিউশনের সাক্ষী হয়েছেন।
ম্যাকেঞ্জি ও ধর্মসম্প্রদায়ের অন্যান্য নেতাদের বিরুদ্ধে আরও বেশ কিছু আইনি মামলা চলছে — সন্ত্রাসবাদ, উগ্রবাদে উসকানি এবং শিশুদের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগে। তবে হত্যার মতো গুরুতর অভিযোগে এই প্রথম তিনি রায়ের মুখোমুখি হচ্ছেন।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কেনিয়ার উপকূলের কাছে শাকাহোলা বনে অগভীর কবরে ৪০০-র বেশি মরদেহ পাওয়া গেছে। এখানেই ম্যাকেঞ্জি সারা দেশ থেকে তাঁর অনুসারীদের নিয়ে এসেছিলেন।
অগভীর কবর খোঁড়ার ভয়াবহ কাজের জন্য কাছাকাছি শহর থেকে ১৭ জন শ্রমিক ভাড়া করা হয়েছিল। কেউ কেউ দৈনিক মাত্র ৮ ডলার পেয়েছিলেন। জেমস নামের এক কবর খোঁড়া শ্রমিক বলেছিলেন, ‘আমরা যে কবরই পেয়েছি, প্রতিটিতে অন্তত তিনটি মরদেহ ছিল। কিছু মরদেহ মাত্র কয়েক সপ্তাহ বয়সী শিশুদের।’
জেমস আরও বলেন, ‘আমরা একবার এক কবরে সারি করে ১২টি শিশুর মরদেহ পেয়েছিলাম। এটা ছিল বিশাল, কাপড়ের মতো সাজিয়ে রাখা ছিল মরদেহগুলো। একটার ওপরে আরেকটা।’ কবর খোঁড়া শ্রমিকেরা জানান, কিছু শিশুর মরদেহের ‘হাত-পা বাঁধা ছিল এবং শরীর চাদরে মোড়ানো ছিল’।
আরেক শ্রমিক সালিম কারিসা দৈনিক প্রায় ৮ ডলারের বিনিময়ে কয়েক ডজন মরদেহ খুঁড়ে বের করেছিলেন। তিনি জানান, তাঁরা মাঝে মাঝে মানুষকে মোটরবাইকে করে বনের ভেতরে নিয়ে যেতেন। ‘কিন্তু এতটাই পরিকল্পিত ও গোপনীয় ছিল যে ভেতরে কী ঘটছে, তা কেউ বলতে পারত না।’
৪৮ বছর বয়সী স্টিফেন মউইটি তাঁর ছয়টি সন্তানকেই হারিয়েছেন এই ধর্মসম্প্রদায়ের কারণে। ম্যাকেঞ্জির বাড়িতে তাঁর মুখোমুখি হতে গিয়ে তিনি ‘অনেক টাক পড়া নারী ও কয়েক ডজন শিশু’কে ম্যাকেঞ্জিকে ঘিরে থাকতে দেখেছিলেন। ম্যাকেঞ্জি নারীদের চুল কামিয়ে ফেলতে বা অগোছালো রাখতে বলতেন, কারণ তিনি মেকআপ ও চুলের ছাঁট নিষিদ্ধ করেছিলেন।
মউইটি বলেন, ‘আজ যদি আমি যাজক ম্যাকেঞ্জির সঙ্গে দেখা করি, আমাদের একজনের মরতেই হবে।’ আবেগাপ্লুত হয়ে তিনি জানান, ‘আমার ছয়টি সন্তানই শাকাহোলা বনে মারা গেছে। আমি শুধু আমার ছেলে স্যামুয়েলের মরদেহ পেয়েছিলাম, তাকে দাফন করেছি।’ মউইটির সাবেক স্ত্রী ম্যাকেঞ্জির পাশে অভিযুক্তদের একজন।
মালিন্দি শহরে নিজের বাড়িতে থাকা ধুলোমাখা একটি টিভি ও ক্যাবল বক্সের দিকে ইঙ্গিত করে মউইটি বলেছিলেন, ‘এই ছোট জিনিসটাই ছিল আমার সব দুর্দশার শুরু।’ এই টিভি থেকেই ম্যাকেঞ্জির মতবাদ তাঁর ঘরে পৌঁছেছিল।
যাজক ২০০৩ সালে গুড নিউজ ইন্টারন্যাশনাল মিনিস্ট্রিজ প্রতিষ্ঠা করেন। পরের ১৬ বছরে গির্জাটি জনপ্রিয়তা পেয়ে কেনিয়ার বিভিন্ন শাখায় হাজারো অনুসারী টেনেছিল। তাঁর গির্জা টাইমস টিভি নামে একটি টেলিভিশন চ্যানেল চালাত, যেখানে মালিন্দির গির্জা থেকে তাঁর ধর্মোপদেশ প্রচার হতো। তাঁর ‘শেষ দিনের’ ধর্মোপদেশে শিক্ষাকে ‘শয়তানি’, স্বাস্থ্যসেবাকে ‘মতবাদের বিরোধী’ এবং ডিজিটাল পরিচয়পত্রকে ‘শয়তানের চিহ্ন’ হিসেবে বর্ণনা করা হতো।
২০১৯ সালে প্রধান গির্জা বন্ধ হয়ে যায় এবং পল ম্যাকেঞ্জি শাকাহোলা বনে চলে যান, তাঁর ভক্তদেরও তাঁর অনুসরণে উৎসাহিত করেন। ম্যাকেঞ্জির ছেলে ড্যান পল ম্যাকেঞ্জি জানান, তিনি গির্জায় ক্যামেরাম্যান হিসেবে কাজ করতেন। কিন্তু বাবার পক্ষে নন তিনি — তাঁর মতে, ‘তিনি ছিলেন নেতা, তাঁকে সবাই শ্রদ্ধা করত। তাই তিনি গণহত্যার খুনি।’
অন্যদিকে ২৩ বছর বয়সী পিটার শুক্রানির মা তাঁকে নিয়ে শাকাহোলায় চলে গিয়েছিলেন। আট বছর বয়স থেকে তিনি ম্যাকেঞ্জির গির্জায় যাওয়া শুরু করেন এবং তাঁকে ‘আধ্যাত্মিক পিতা’ হিসেবে বর্ণনা করেন। বনে থাকার সময় শুক্রানি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং চিকিৎসা নিষিদ্ধ থাকায় তাঁর অবস্থার অবনতি হয়। ২০২৩ সালের মার্চে তিনি উদ্ধার হন। তবু তিনি বিশ্বাস করেন ম্যাকেঞ্জি ‘একজন ভালো মানুষ’ — ‘ম্যাকেঞ্জি কাউকে উপোস করতে বাধ্য করেননি। মানুষ নিজের বিশ্বাস থেকে নিজেরাই সেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।’
হত্যার এই মামলায় ২৯৮ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্রে ম্যাকেঞ্জি ও তাঁর অনুসারীদের বিরুদ্ধে যাদের হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে, তাদের সবাই শিশু। অনেক মরদেহের পরিচয় এখনো শনাক্ত করা যায়নি, পচনের অগ্রসর অবস্থার কারণে। আদালতের কাগজপত্রে বেশ কয়েকজনকে ‘অজ্ঞাতনামা বালক’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, কবরের অবস্থান ও আবিষ্কারের তারিখ দিয়ে চিহ্নিত করে।
এই রায়ের দিকে এখন তাকিয়ে আছেন নিহত শিশুদের শোকার্ত পরিবার ও পুরো কেনিয়া। অনশনে মারা যাওয়া, শ্বাসরোধ করে হত্যা এমনকি পিটিয়ে হত্যার এই ভয়াবহ অধ্যায়ের পর আদালতের রায় ন্যায়বিচারের প্রথম ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।






