খাবারের জন্য আকুতি জানানো সেই ভিডিওর নূরজাহান বেগম আর নেই
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খাবারের জন্য আকুতি জানিয়ে আলোচনায় আসা শেরপুরের বৃদ্ধ সাজু শেখের স্ত্রী নূরজাহান বেগম আর নেই। দীর্ঘদিন শয্যাশায়ী থাকার পর রোববার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে নিজ বাড়িতেই তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন।
একই দিন বিকেল ৫টার দিকে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়। স্থানীয় ইউপি সদস্য ইলিয়াস মিয়া নূরজাহান বেগমের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
ইলিয়াস মিয়া জানান, দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ অবস্থায় বিছানায় ছিলেন নূরজাহান বেগম। রোববার দুপুরে তিনি মারা যান।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ছয় বছর আগে পড়ে গিয়ে কোমরের হাড় ভেঙে যাওয়ার পর থেকেই চলাফেরার সক্ষমতা হারান নূরজাহান বেগম। আর্থিক সংকটের কারণে তাঁর প্রয়োজনীয় চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি।
অসুস্থ স্ত্রীকে দেখাশোনা করতে গিয়ে ৮০ বছর বয়সী সাজু শেখ নিজেও চরম সংকটে পড়েন। নিজেদের খাবার, ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ জোগাতেই হিমশিম খেতে হতো তাঁদের।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরে ‘আল্লাহ, আমাকে খাবার দাও, আমার স্ত্রীকে নিয়ে খুব কষ্টে আছি’ বলে আকুতি জানাতে দেখা যায় সাজু শেখকে। তাঁর সেই অসহায় আবেদন মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যায়।
ভিডিওটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে বিভিন্ন ব্যক্তি, সামাজিক সংগঠন ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁদের খোঁজ নেওয়া হয়। তাঁদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয় মানবিক সহায়তাও।
জানা গেছে, সাজু শেখ ও নূরজাহান বেগম প্রায় ৬৫ বছর একসঙ্গে সংসার করেছেন। দীর্ঘ এই দাম্পত্য জীবনে দারিদ্র্য, বার্ধক্য ও অসুস্থতার মতো নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তাঁরা একে অপরের পাশে ছিলেন।
বয়সের ভারে ন্যুব্জ ও নিজে অসুস্থ হয়েও শেষ দিন পর্যন্ত শয্যাশায়ী স্ত্রীর সেবা করে গেছেন সাজু শেখ — এই চিত্রই ভিডিওটির মাধ্যমে বহু মানুষের কাছে পৌঁছেছিল।
পরিবারের সদস্যরা জানান, তাঁদের তিন ছেলে ও তিন মেয়ে রয়েছে। তবে সন্তানরাও আর্থিকভাবে অসচ্ছল। ছেলে নূর ইসলাম দিনমজুরি ও ঠেলাগাড়ি চালিয়ে সাধ্যমতো মা-বাবার দেখাশোনা করতেন।
কিন্তু নিজের সংসারের খরচ মেটাতেই নূর ইসলামকে কঠিন সংগ্রাম করতে হয়। ফলে বৃদ্ধ দম্পতির চিকিৎসা ও ভরণপোষণের পুরো দায়িত্ব বহন করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি।
নূরজাহান বেগমের মৃত্যুতে ছয় দশকেরও বেশি সময়ের জীবনসঙ্গীকে হারিয়ে একাকী হয়ে পড়েছেন সাজু শেখ। যে স্ত্রীকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং দুমুঠো খাবারের জন্য একদিন আকুতি জানিয়েছিলেন তিনি, সেই জীবনসঙ্গীকে হারিয়ে এখন আরও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন এই বৃদ্ধ।
তাঁর মৃত্যুর পর এই দম্পতির গল্প আবার সামনে এনেছে সেই প্রশ্ন, ভিডিও ভাইরাল হলে সহায়তা পৌঁছালেও যাঁদের কষ্ট ক্যামেরায় ধরা পড়ে না, তাঁদের কাছে সহায়তা পৌঁছায় কীভাবে — তবে আপাতত শেরপুরের ওই বাড়িতে শোকের পাশাপাশি রয়ে গেছে সাজু শেখের একাকী জীবনের অনিশ্চয়তা।



