রাশিয়ায় এক হাজারের বেশি ড্রোন হামলা ইউক্রেনের: তেল স্থাপনায় আগুন, নিহত অন্তত একজন
রাশিয়ায় এক হাজারের বেশি ড্রোন দিয়ে হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন, যা যুদ্ধের অন্যতম বৃহত্তম আকাশ হামলা। এই হামলায় অন্তত একজন নিহত ও পাঁচজন আহত হয়েছেন। কিয়েভ ও ওয়াশিংটনের মধ্যে বাড়তে থাকা টানাপোড়েনের মধ্যেই এই হামলা হলো।
সেন্ট পিটার্সবার্গের গভর্নর আলেকজান্ডার বেগলভ বলেছেন, রবিবারের হামলায় সেন্ট পিটার্সবার্গ তেল টার্মিনাল, রুচি তেল ডিপো এবং শহরের দক্ষিণে কোলপিনস্কি জেলার শিল্প গুদামগুলোতে লাগা আগুন নেভাতে দমকলকর্মীরা লড়াই করছেন।
গভর্নর বলেন, এই ‘ব্যাপক’ হামলায় অন্তত একজন নিহত ও পাঁচজন আহত হয়েছেন, এবং কয়েকটি আবাসিক ভবন ও দুটি বাড়িও আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে।
হামলার কারণে সেন্ট পিটার্সবার্গের প্রধান বিমানবন্দরে ফ্লাইট চলাচল ব্যাহত হয়। দেশের অন্যতম ব্যস্ত এই বিমানবন্দর ‘নিরাপত্তার কারণে’ কার্যক্রম সীমিত করে বলে বেগলভ জানান।
রাশিয়ার ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ওজোন জানিয়েছে, সেন্ট পিটার্সবার্গে তাদের লজিস্টিকস হাবে আগুন লেগেছে। ইন্টারনেট প্রতিষ্ঠান ভিকে বলেছে, বৃহত্তর লেনিনগ্রাদ অঞ্চলে তাদের ডেটা সেন্টারে ড্রোন হামলা হয়েছে, তবে ব্যবহারকারীদের জন্য স্বাভাবিক সেবা চালু রয়েছে।
লেনিনগ্রাদ গভর্নর আলেকজান্ডার দ্রোজদেঙ্কো বলেন, ১৪৫টি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে এবং ড্রোন হামলার পর প্রায় ২০ হাজার মানুষ বিদ্যুৎবিহীন হয়ে পড়েছেন। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রাতভর রাশিয়ার ১৫টি অঞ্চল, সংযুক্ত করা ক্রিমিয়া উপদ্বীপ ও কৃষ্ণ সাগরের ওপর দিয়ে আসা ১ হাজার ১৫টি ইউক্রেনীয় ড্রোন নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে।
এই হামলাগুলো এমন এক সময়ে হলো, যখন কিয়েভ ও ওয়াশিংটনের মধ্যে টানাপোড়েন গভীর হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়ার তেল অবকাঠামোতে ইউক্রেনের হামলার সমালোচনা করেছেন, আর মস্কোর বিরুদ্ধে আরও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার সম্ভাবনাও এখনও অনিশ্চিত।
রবিবার ট্রাম্প শুক্রবারের সেই সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দেন, যেখানে তিনি রাশিয়ার বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা স্থগিত রেখেছিলেন। তিনি বলেন, তিনি এমন কিছু করতে চান না যা ‘মূর্খের মতো’ মস্কোকে আলোচনার টেবিল থেকে দূরে ঠেলে দেবে। সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া পোস্টে তিনি বলেন, নতুন নিষেধাজ্ঞা মস্কোর যুদ্ধ শেষ করার কূটনৈতিক আলোচনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে বলে তিনি মনে করেন—এমন অবস্থান দ্বিদলীয় সমালোচনার মুখে পড়লেও তিনি তা ধরে রেখেছেন।
ট্রাম্প ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিরও সমালোচনা করেন। পুতিনের সঙ্গে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক যোগাযোগের সমালোচনা করা জেলেনস্কি রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা চালাচ্ছেন দাবি করে ট্রাম্প বলেন, জেলেনস্কি ‘এই যুদ্ধ শেষ করতে চান না’।
ট্রাম্প ১১ অক্টোবর ঘোষণা দিয়েছিলেন, রাশিয়া ও ইউক্রেন একটি ‘জ্বালানি যুদ্ধবিরতিতে’ সম্মত হয়েছে, তবে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি। জেলেনস্কি ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেন, কয়েক দিন পর তিনি সেই যুদ্ধবিরতি থেকে সরে এসেছেন, কারণ মস্কো ইউক্রেনের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চালিয়ে যাওয়ার সময় তিনি রাশিয়ার জ্বালানি স্থাপনায় হামলা থেকে বিরত ছিলেন।
জেলেনস্কি রবিবার এক্সে লিখেছেন, ট্রাম্পের ঘোষণার পরের এক সপ্তাহে রাশিয়া ইউক্রেনের জ্বালানি, তেল ও গ্যাস খাতে ৭৬ বার হামলা চালিয়েছে। রাতভর চারটি ইউক্রেনীয় অঞ্চলে জ্বালানি স্থাপনা আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে, হাজার হাজার পরিবার বিদ্যুৎবিহীন হয়ে পড়েছে বলে তিনি জানান এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে ‘ব্ল্যাকআউট ঘটানোর চেষ্টার’ অভিযোগ তোলেন।
এনবিসির ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে রবিবার জেলেনস্কি বলেন, রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলে পুতিনের যুদ্ধপ্রচেষ্টা শক্তিশালী হবে। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইউক্রেন গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান পুনরায় শুরু হয়েছে, যা ‘কিছু সময়ের জন্য বন্ধ’ ছিল। তাঁর ভাষায়, তিনি ট্রাম্পকে বিশ্বাস করেন, তবে মস্কোর পক্ষ নেওয়া ওয়াশিংটনের জন্য হবে এক ট্র্যাজেডি ও ‘ঐতিহাসিক ভুল’।
পরে রবিবার জেলেনস্কি সামাজিক মাধ্যমে জানান, তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্টের দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে ৯ অক্টোবর মিয়ামিতে ওয়াশিংটন ও কিয়েভের আলোচক দলের বৈঠকের ফলাফল এবং ‘কূটনীতির পরবর্তী পদক্ষেপ’ নিয়ে কথা বলেছেন। এদিকে রাশিয়ার এক বিমান হামলায় রাজধানী কিয়েভে এক নারী নিহত হয়েছেন বলে মেয়র ভিতালি ক্লিচকো টেলিগ্রামে জানান; হামলায় একটি পাতাল রেল স্টেশন ও একটি ২৫ তলা আবাসিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং আরও তিনজন আহত হন। জেলেনস্কির হিসাব অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে রাশিয়া ইউক্রেনে প্রায় ২ হাজার ৭০০টি হামলাকারী ড্রোন, ১ হাজার ৭০০টি আকাশ বোমা ও ৬৬টি ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালিয়েছে, যার বেশিরভাগই ব্যালিস্টিক।






