বিবাহবিচ্ছেদের পর মদ্যপানে আসক্তি, ২৬ দিন পুনর্বাসন কেন্দ্রে ছিলেন চাহাল: পডকাস্টে খুললেন মানসিক চাপের গল্প
ব্যক্তিগত জীবনের টানাপোড়েন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা আর মানসিক চাপ—কঠিন এক সময়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল ভারতের লেগ স্পিনার যুজবেন্দ্র চাহালকে। কোরিওগ্রাফার ধনশ্রী বার্মার সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদের পর উদ্বেগ, প্যানিক অ্যাটাক এবং ক্রিকেট থেকে সাময়িক বিরতি নেওয়ার অভিজ্ঞতার কথা এবার প্রকাশ্যে জানিয়েছেন তিনি। এমনকি পরিস্থিতি সামাল দিতে ২৬ দিন একটি পুনর্বাসন কেন্দ্রেও কাটিয়েছেন এই স্পিনার।
ভারতের সাবেক ওপেনার আকাশ চোপড়ার পডকাস্ট 'বেইথ অ্যান্ড বল'-এ নিজের কঠিন সময়ের কথা তুলে ধরেন চাহাল। তাঁর ভাষ্য, ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে জনসমক্ষে আলোচনা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা মন্তব্য তাঁর মানসিক অবস্থার ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল। সেই চাপ একপর্যায়ে মাঠের পারফরম্যান্সেও প্রভাব ফেলতে শুরু করে। ৩৬ বছর বয়সী এই ক্রিকেটার জানান, পরিচিত মুখ হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছিল।
উদ্বেগের তীব্রতা বোঝাতে গিয়ে প্যানিক অ্যাটাকের সময় নিজের শারীরিক অবস্থার বর্ণনাও দিয়েছেন চাহাল। তাঁর ভাষায়, 'প্যানিক অ্যাটাকের সময় আমার মুখটা কুঁচকে যেত। আমি কথাও বলতে পারতাম না।' তাঁর হৃদস্পন্দন দ্রুত বেড়ে যেত, মুখের পেশি শক্ত হয়ে আসত। কখনও ঠোঁট একদিকে বেঁকে যেত, এমনকি কথা বলাও কঠিন হয়ে পড়ত। এ ধরনের অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনে আগে কখনও হয়নি বলেও জানিয়েছেন এই স্পিনার।
চাহাল জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে ক্রমাগত আলোচনা চলছিল এবং এসব মন্তব্যে তিনি কষ্ট পেতেন। মানসিক চাপ বাড়তে থাকায় স্বাভাবিক জীবনযাপন ও ক্রিকেটে মনোযোগ ধরে রাখাও কঠিন হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে তিনি বুঝতে পারেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষ তাঁর সম্পর্কে কী বলছে, তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তাই অন্যদের মন্তব্য নিয়ে পড়ে না থেকে জীবনকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
ব্যক্তিগত জীবনের এই কঠিন সময় ক্রিকেট থেকেও সাময়িকভাবে দূরে সরিয়ে দিয়েছিল চাহালকে। তিনি জানান, ওই পর্যায়ে বিরতি নেওয়ার আগে সাদা বলের ক্রিকেটে মাত্র দুটি ম্যাচ খেলেছিলেন। মানসিকভাবে প্রতিযোগিতায় নামার মতো প্রস্তুত ছিলেন না বলেই সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর অনুভূতি হচ্ছিল, নিজের সেরা অবস্থায় নেই। একই সঙ্গে নিজের সমস্যার প্রভাব যেন দলের ওপর না পড়ে, সেটিও তাঁর ভাবনায় ছিল।
এ বিষয়ে তিনি বিসিসিআইয়ের সাবেক কোষাধ্যক্ষ অনিরুদ্ধ চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। চাহালের সিদ্ধান্তে সমর্থন দিয়েছিলেন অনিরুদ্ধ। খেলোয়াড়টির ভাষ্য অনুযায়ী, দলের স্বার্থে নিজের অবস্থা খোলাখুলি জানিয়ে সাময়িকভাবে সরে দাঁড়ানোই ছিল সঠিক সিদ্ধান্ত। এতে অন্তত তাঁর মানসিক অবস্থা নিয়ে দলে কোনো অনিশ্চয়তা রইল না।
পডকাস্টে নিজের জীবনের আরেকটি কঠিন দিকও তুলে ধরেছেন চাহাল। বিবাহবিচ্ছেদের সময় ব্যক্তিগত সংকটের মধ্যে তাঁর মদ্যপানের পরিমাণ বেড়ে গিয়েছিল বলে স্বীকার করেছেন তিনি। আইপিএলে খেলার শুরুর দিকে বন্ধুদের সঙ্গে সামাজিক পরিসরে মদ্যপান করতেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে থাকে।
একপর্যায়ে তিনি বুঝতে পারেন, এভাবে চলতে থাকলে জীবনের সবচেয়ে প্রিয় বিষয় ক্রিকেটই হারিয়ে ফেলতে পারেন। এরপর পেশাদার একজনের সহায়তা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। ২৬ দিন একটি পুনর্বাসন কেন্দ্রে কাটান এই স্পিনার। তাঁর মতে, সেই অভিজ্ঞতা নিজের জীবন ও আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে সাহায্য করেছে।
কঠিন সময়ে পরিবার ও সবচেয়ে কাছের বন্ধুও পাশে ছিলেন বলে জানিয়েছেন চাহাল। তাঁদের সমর্থন তাঁর ঘুরে দাঁড়ানোর পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। পরিবারের সান্নিধ্য ও বন্ধুদের উৎসাহই তাঁকে মানসিক অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসতে সহায়তা করেছে। এই কৃতজ্ঞতার কথাও পডকাস্টে উল্লেখ করেন তিনি।
চাহাল ও ধনশ্রী বার্মার গল্পটি একসময় ভক্তদের প্রিয় ছিল। কোরিওগ্রাফার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পরিচিত মুখ ধনশ্রীর সঙ্গে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে বিয়ে হয়েছিল চাহালের। ২০২৫ সালের মার্চে তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ চূড়ান্ত হয়। বিচ্ছেদের বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল, যা সামলানো তাঁর জন্য সহজ ছিল না বলে জানিয়েছেন চাহাল।
এখন মানসিকভাবে অনেক ভালো আছেন বলে জানিয়েছেন ভারতের এই ক্রিকেটার। নিজের ফিটনেস ও ব্যক্তিগত সুস্থতার দিকেও মনোযোগ দিচ্ছেন তিনি। চাহালের কাছে ঘুরে দাঁড়ানোর অর্থ শুধু আবার উইকেট নেওয়া নয়; বরং নিজের জীবনকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনা। পডকাস্টে তাঁর এই খোলামেলা স্বীকারোক্তি ভক্তদের কাছে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
ক্রীড়া মনোবিজ্ঞানীদের মতে, চাহালের মতো তারকা ক্রিকেটারদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলা গুরুত্বপূর্ণ একটি দৃষ্টান্ত। অনেক খেলোয়াড়ই ব্যক্তিগত সংকটের মধ্যে দিয়ে যান, কিন্তু পেশাদার চাপের কারণে সেটি স্বীকার করতে দ্বিধা করেন। চাহালের এই সাক্ষাৎকার অনেক খেলোয়াড়কে নিজের সমস্যা নিয়ে এগিয়ে আসতে উৎসাহিত করতে পারে।
চাহালের ভক্তদের এখন একটাই প্রত্যাশা—মানসিকভাবে সুস্থ এই স্পিনার আবার মাঠে ফিরে তাঁর চেনা ঘূর্ণিতে ব্যাটসম্যানদের বিভ্রান্ত করবেন। পুনর্বাসন শেষে ফিটনেস নিয়ে কাজ করা এই ক্রিকেটার কবে জাতীয় দলের জার্সিতে ফিরবেন, সেদিকেই এখন তাকিয়ে ভারতীয় ক্রিকেটপ্রেমীরা। তবে চাহাল নিজে বলছেন, ফেরার চেয়ে নিজের জীবনটাকে ঠিক রাখাটাই এখন তাঁর প্রধান লক্ষ্য।



