সিম্পসন হত্যাকাণ্ডে নতুন রহস্য: মাফিয়া তথ্যদাতার সম্পৃক্ততার প্রশ্ন তুলল টাইমসের অনুসন্ধান
তিন দশক আগের কুখ্যাত ও. জে. সিম্পসন হত্যাকাণ্ড নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে নিউইয়র্ক টাইমসের একটি গভীর অনুসন্ধান। আগে সিল করা আদালতের নথি ও সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে করা এই অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, সাবেক স্ত্রী হত্যায় অভিযুক্ত কিন্তু খালাস পাওয়া সিম্পসনের ঘটনাস্থলে কোনো সহযোগী ছিল কি না, তা ক্যালিফোর্নিয়ার প্রসিকিউটররা পুরোপুরি তদন্তই করতে পারেননি। আর তাতে জড়িয়ে গেছে এক মাফিয়া সদস্য-পরিণত-তথ্যদাতার নাম, যিনি হত্যাকাণ্ড আড়াল করতেও সাহায্য করে থাকতে পারেন।
১৯৯৪ সালে লস অ্যাঞ্জেলেসে সিম্পসনের সাবেক স্ত্রী নিকোল ব্রাউন সিম্পসন ও তাঁর বন্ধু রোনাল্ড গোল্ডম্যানকে তাদের বাড়ির বাইরে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। আমেরিকান পেশাদার ফুটবল খেলোয়াড় ও অভিনেতা ও. জে. সিম্পসনকে ওই হত্যায় সন্দেহ করা হয়। তাঁর বিচার আন্তর্জাতিক মনোযোগ কাড়ে, গণমাধ্যমে তা পরিণত হয় বিশাল আয়োজনে এবং মামলাটি ‘শতাব্দীর বিচার’ নামে পরিচিতি পায়।
হত্যার কয়েক দিন পর, ১৯৯৪ সালের ১৭ জুন, সিম্পসনকে গ্রেফতারের চেষ্টা হলে তিনি পালিয়ে যান। তাঁর বন্ধু, সাবেক ফুটবল তারকা আল কাউলিংস সাদা ব্রঙ্কো গাড়িতে সিম্পসনকে নিয়ে লস অ্যাঞ্জেলেসজুড়ে পুলিশের সঙ্গে ব্যাপক প্রচার পাওয়া ধাওয়ার ঘটনা ঘটান, যা লাখো মানুষ টেলিভিশনে দেখেছিলেন।
দীর্ঘ বিচারের পর ১৯৯৫ সালে জুরি সিম্পসনকে খালাস দেন। মামলাটি তদন্ত করেছিল লস অ্যাঞ্জেলেস পুলিশ বিভাগ, যার বর্ণবাদের দীর্ঘ ইতিহাস ছিল। সিম্পসনের আইনজীবীরা পুলিশের বর্ণবাদী আচরণ ও গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ সামলানোর ধরন তুলে ধরেন, যা খালাস পেতে সাহায্য করে। পরে একটি দেওয়ানি মামলায় জুরি সিম্পসনকে ওই মৃত্যুগুলোর জন্য দায়ী সাব্যস্ত করেছিল। তবে ১৯৯৪ সালের ওই দুই হত্যায় ফৌজদারি মামলায় কেউ কখনো দোষী সাব্যস্ত হননি।
নিউইয়র্ক টাইমস এখন জানিয়েছে, প্রসিকিউশনের শেষদিকে এক তথ্যদাতা সিম্পসনের মামলা সম্পর্কে তথ্য দিতে শুরু করেন। ওই তথ্যদাতা ছিলেন ধনী মাফিয়া সদস্য জোসেফ ইপ্পোলিতো, যিনি ফেডারেল সরকারের হাত থেকে বছরের পর বছর পলাতক থাকার পর তথ্যদাতা বনে যান। তাঁর কাছে থাকা তথ্য বিচারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারত, কিন্তু প্রসিকিউশনের পক্ষে তাঁর সাক্ষ্য অন্তর্ভুক্ত করার জন্য ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল।
‘জোয়ি’ নামে পরিচিত ইপ্পোলিতো ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে দীর্ঘদিনের মাদক পাচারকারী। তিনি এসেছিলেন নিউ জার্সির অপরাধজগৎ থেকে, যেখানে তাঁর বাবা ছিলেন ইতালীয়-আমেরিকান প্রধান অপরাধী সংগঠন ডিকাভালকান্তে ক্রাইম ফ্যামিলির একজন প্রভাবশালী সদস্য। পূর্ব উপকূলে মাদক পাচারের দায়ে কারাভোগের পর ১৯৮০-র দশকের শেষদিকে তিনি ক্যালিফোর্নিয়ায় চলে যান এবং একটি ইতালীয় রেস্তোরাঁ পরিচালনা করেন।
সেখানে তিনি লস অ্যাঞ্জেলেসের অভিজাত মহলের ভেতরের বলয়ে ঢুকে পড়েন। সিম্পসনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু আল কাউলিংসের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব হয়। কিন্তু তারকাদের সঙ্গে সময় কাটানোর পাশাপাশি ইপ্পোলিতো মাদক বিক্রি ও পাচার চালিয়ে যান।
১৯৯২ সালে একটি ফাঁদ অভিযানে কর্তৃপক্ষ তাঁকে আবার গ্রেফতার করে। কিন্তু সাজা ঘোষণার আট মাস পর, ১৯৯৪ সালের মে মাসে, তিনি ফ্লোরিডার কারাগার থেকে পালিয়ে যান। ভাইয়ের সাহায্যে তিনি লস অ্যাঞ্জেলেসে ফিরে আসেন এবং ওয়ান্টেড পলাতক হিসেবে আত্মগোপনে থাকেন।
সেই বছরই লস অ্যাঞ্জেলেসে নিকোল ব্রাউন সিম্পসন ও গোল্ডম্যানের হত্যাকাণ্ড ঘটে। সিম্পসনের গ্রেফতারের পর কর্মকর্তারা কাউলিংসের মানিব্যাগে ইপ্পোলিতোর তথ্য পান, যা দেখে তাঁরা পলাতক মাফিয়া সদস্যটিকে জরুরিভাবে খুঁজতে শুরু করেন। শেষ পর্যন্ত তাঁকে পেয়ে গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু ইপ্পোলিতো পক্ষ বদলে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের তথ্যদাতা হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
তথ্যদাতা হিসেবে ইপ্পোলিতো সারা দেশের নানা মাদক চুক্তির তথ্য দেন এবং ফেডারেল সংস্থাগুলোকে ফাঁদ অভিযান সাজাতে সাহায্য করেন। কিন্তু তিনি লস অ্যাঞ্জেলেসের হত্যাকাণ্ড সম্পর্কেও সরকারকে তথ্য দিয়েছিলেন বলে জানা গেছে।
সিম্পসন মামলায় ইপ্পোলিতোর সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা নিয়ে টাইমস তিনটি আলাদা তত্ত্ব তুলে ধরেছে, যেগুলো তিনি কর্তৃপক্ষকে জানাতে ইচ্ছুক ছিলেন বলে মনে হয়। প্রথম সংস্করণ অনুযায়ী, তিনি ফেডারেল প্রসিকিউটরদের বলেছিলেন, হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে কাউলিংসের কাছ থেকে শোনা তথ্য তাঁর কাছে আছে, যার মধ্যে নিখোঁজ অস্ত্রটির সম্ভাব্য অবস্থানও রয়েছে।
দ্বিতীয় সংস্করণে, ইপ্পোলিতোর ভাই টাইমসের এক প্রতিবেদককে বলেছেন, ইপ্পোলিতো হত্যার ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে থাকতে পারেন; ভাইয়ের ভাষ্য, তাঁর হাতে আক্ষরিক অর্থেই রক্ত লেগে ছিল। তৃতীয় সংস্করণ অনুযায়ী, লস অ্যাঞ্জেলেসজুড়ে পুলিশের সেই ধাওয়ার সময় সিম্পসনকে পালাতে সাহায্য করার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন ইপ্পোলিতো।
নিউইয়র্ক টাইমসের ভাষ্য, সব মিলিয়ে এই উপাদানগুলো ভিন্ন ভিন্ন দিকে ইঙ্গিত করে, কিন্তু পুলিশ ও প্রসিকিউটরদের দেওয়া আনুষ্ঠানিক বয়ান থেকে তা উল্লেখযোগ্যভাবে সরে যায়। পত্রিকাটি লিখেছে, মূল চরিত্রদের অনেকেই এখন মৃত, ফলে পুরো সত্য হয়তো কখনোই জানা যাবে না।
তবে ইপ্পোলিতোর ভাই, যিনি টাইমসকে বলেছিলেন তিনি ভাইয়ের হাতে রক্ত দেখেছেন, পরে পত্রিকাটির কাছে অর্থ চান এবং নিজের বক্তব্য প্রত্যাহার করে নেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি বলেছিলেন, অন্য কোথাও, সম্ভবত কোনো টেলিভিশন অনুষ্ঠানে, গল্পটি বলার জন্য তাঁকে ‘প্রচুর অর্থের’ প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
ইপ্পোলিতোর সম্পৃক্ততার মাত্রা পুরোপুরি জানা যায়নি। টাইমসের সঙ্গে কথা বলা কর্তৃপক্ষের অনেকে তিনি কতটা জড়িত ছিলেন এবং তাঁর তথ্যের মূল্য কতটা, তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। ফলে তিন দশক পরও সিম্পসন মামলার সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি—ঘটনাস্থলে তিনি একা ছিলেন কি না—উত্তরহীনই থেকে যাচ্ছে।






