দেড় কোটি টাকার অক্সিজেন প্ল্যান্ট দুই বছর ধরে অচল ঠাকুরগাঁও হাসপাতালে
ঠাকুরগাঁও জেনারেল হাসপাতালে ১ কোটি ৬৮ লাখ টাকা ব্যয়ে স্থাপন করা অক্সিজেন প্ল্যান্টটি দীর্ঘদিন ধরে অলস পড়ে আছে। ২০২২ সালে চালু হওয়ার পর তিন বছর ধরে রোগীদের সেবা দিলেও কারিগরি জনবল ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই সেবা ব্যবস্থাটি এখন বন্ধ। এতে একদিকে নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান যন্ত্রাংশ, অন্যদিকে জরুরি মুহূর্তে বিকল্প অক্সিজেন সরবরাহ নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
প্ল্যান্টটি প্রাকৃতিক বাতাস থেকে অক্সিজেন উৎপাদন ও পরিশোধনের পর পাইপলাইনের মাধ্যমে হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে সরবরাহের জন্য স্থাপন করা হয়েছিল। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, দক্ষ অপারেটর ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়া এটি চালু রাখা সম্ভব নয়।
হাসপাতাল ও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা গেছে, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে ২০২২ সালের শুরুতে সেন্ট্রাল মেডিকেল স্টোরস ডিপোর (সিএমএসডি) চুক্তির আওতায় প্ল্যান্টটি স্থাপন করে মেসার্স আল-মদিনা ট্রেডার্স।
চুক্তি অনুযায়ী, প্রথম তিন বছর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব প্রকৌশলী ও টেকনিশিয়ানদের মাধ্যমে প্ল্যান্টটি সচল রাখা হয়। তবে ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কারিগরি লোকজনের আসা বন্ধ হয়ে যায়। একপর্যায়ে প্ল্যান্টটি বন্ধ হয়ে পড়ে এবং তারপর থেকে আর চালু হয়নি।
হাসপাতালের তৎকালীন আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা রকিবুল আলম চয়ন বলেন, প্ল্যান্টটি ২০২২ সালের দিকে এনএসআইয়ের বিশেষ তত্ত্বাবধানে এবং তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট লোকবলের মাধ্যমে পরিচালিত হতো। এটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত চাহিদাপত্রের ভিত্তিতে আসেনি। তৎকালীন সময়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট তদারকি সংস্থার নিজস্ব লোকজনের মাধ্যমেই এটি চালু ছিল।
তিনি আরও বলেন, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর সেই টেকনিশিয়ানদের আসা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মেশিনটিতে বড় কোনো জটিল সমস্যা না থাকলেও সেটি নিরাপদে চালাতে তিন শিফটে অন্তত তিন থেকে চারজন দক্ষ অপারেটর প্রয়োজন। কিন্তু হাসপাতালে নিজস্ব কোনো টেকনিশিয়ান নেই।
নিয়মিত তদারকি ও লগবই রক্ষণাবেক্ষণ না করে মেশিনটি চালালে শর্টসার্কিট, আগুন লাগা, এমনকি ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঝুঁকি থাকে বলেও সতর্ক করেছেন তিনি। প্ল্যান্ট বন্ধ থাকার বিষয়টি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে এবং পুনরায় রিমাইন্ডার দিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে। তবে এখনো কোনো সমাধান আসেনি।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স আল-মদিনা ট্রেডার্সের প্রতিনিধি ওমর ফারুক বলেন, সিএমএসডির সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী তিন বছরের ওয়ারেন্টি মেয়াদে তাঁদের নিজস্ব টেকনিশিয়ান দিয়ে প্ল্যান্টটি সচল রাখা হয়েছিল। পাশাপাশি হাসপাতালের তিনজন কর্মীকে এটি পরিচালনার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। মেয়াদ শেষে সিএমএসডির ভেরিফিকেশন টিম সরেজমিন তদন্ত করে সব সন্তোষজনক পাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির ১০ শতাংশ পারফরম্যান্স গ্যারান্টির টাকা ছাড় করে দেওয়া হয়।
ওমর ফারুকের ভাষ্য, চুক্তি শেষ হওয়ায় এখন প্ল্যান্টটি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের সম্পূর্ণ দায়িত্ব সরকারি দপ্তর ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, প্ল্যান্টটি প্রায় এক মাস বন্ধ থাকার পর ২০২৪ সালের ৩১ আগস্ট হাসপাতালের তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সিরাজুল ইসলাম ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে তাগিদপত্র পাঠান। এরপরও প্ল্যান্টটি চালুর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) ঠাকুরগাঁও জেলা সভাপতি আব্দুল লতিফ বলেন, জরুরি চিকিৎসায় সব সময় বিকল্প সাপোর্ট থাকা জরুরি। প্রধান লাইন কোনো কারণে বন্ধ হলে বিকল্প প্রাকৃতিক অক্সিজেনের এই প্ল্যান্টই হতে পারত একমাত্র ভরসা, যা এখন অচল হয়ে আছে। দিন শেষে এটি রাষ্ট্রের সম্পদ। অহেতুক ফেলে না রেখে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উচিত দ্রুততম সময়ে এখানে প্রেষণে টেকনিশিয়ান নিয়োগ দিয়ে কোটি টাকার এই প্ল্যান্টটি সচল করা, যাতে এলাকার মানুষ এর সুফল পেতে পারেন।
সব মিলিয়ে দেড় কোটি টাকার বেশি মূল্যের এই প্ল্যান্টটি কবে আবার সচল হবে, তা এখনো অনিশ্চিত। টেকনিশিয়ান নিয়োগ বা প্রেষণে পাঠানোর সিদ্ধান্ত না এলে ঠাকুরগাঁওয়ের রোগীদের জরুরি অক্সিজেনের জন্য বিকল্প ব্যবস্থার ওপরই নির্ভর করে থাকতে হবে।




