শিকাগোর সাউথ সাইডে সিনথেটিক মাদকের নতুন ঢেউ, গভীর হচ্ছে মার্কিন সংকট
যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে সিনথেটিক মাদকের এক নতুন ঢেউ। সস্তা অথচ আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী এই মাদকগুলো দেশটির দশকের পর দশক ধরে চলা মাদক সংকটকে আরও গভীর করে তুলতে পারে বলে সতর্ক করছেন কর্মকর্তারা। সংকটের একেবারে সামনের সারির চিত্র দেখতে শিকাগোর সাউথ সাইডে ঘুরেছেন বিবিসির প্রতিবেদক কোয়েন্টিন সমারভিল; সেখানকার সম্প্রদায়গুলো প্রতিদিন এই বিপদের সঙ্গে লড়াই করছে।
পরিসংখ্যানের দিক থেকে সম্প্রতি কিছুটা স্বস্তির ছবি দেখা গেলেও উদ্বেগ কমছে না। মাদক সেবনে মৃত্যুর সংখ্যা ২০২২ সালে সর্বোচ্চ প্রায় ১ লাখ ১০ হাজারে পৌঁছেছিল; গত বছর তা কমে এসেছে প্রায় ৭০ হাজারে। কিন্তু কর্তৃপক্ষের আশঙ্কা, এই পতন ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে, কারণ বাজারে ঢুকছে নতুন ধরনের সিনথেটিক মাদক, যা তৈরি করা সহজ, দামে সস্তা, অথচ প্রাণঘাতী প্রভাবে ভয়ংকর।
কর্মকর্তাদের বিশেষ উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে ‘ট্র্যাংক’ নামে পরিচিত একটি পশু-ঘুমপাড়ানি ওষুধ। মানুষের শরীরে ব্যবহারের জন্য নয় এমন এই উপাদান অন্য মাদকের সঙ্গে মিশিয়ে বিক্রি হচ্ছে বলে জানা যাচ্ছে। এমন অননুমোদিত মিশ্রণ সেবনকারীর জন্য পরিণতি আরও অনিশ্চিত ও মারাত্মক করে তোলে, আর জরুরি চিকিৎসা দেওয়ার কাজটাও কঠিন হয়ে পড়ে।
রাজনৈতিক অঙ্গনেও মাদক এখন বড় ইস্যু। চলতি বছরের শুরুর দিকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মাদক চক্রগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর অভিযানের অঙ্গীকার করেন; অনেক চক্রকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সরকারের সেই কঠোর অবস্থানের মধ্যেই নতুন সিনথেটিক মাদকের বিস্তার প্রশাসনের সামনে নতুন পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শিকাগোর সাউথ সাইডের চিত্রটা সেই পরীক্ষার সবচেয়ে কঠিন রূপ। সেখানকার বাসিন্দাদের কাছে মাদক সংকট কোনো দূরের পরিসংখ্যান নয় — প্রতিবেশ, পরিবার আর প্রতিদিনের জীবনের ভেতর দিয়ে তারা এ সংকট দেখছেন। বিবিসির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, সম্প্রদায়ের মানুষজন নিজেদের এলাকাকে এই বিপদ থেকে বাঁচাতে লড়ে যাচ্ছেন, যদিও মাদকের সরবরাহের গতি তাদের চেষ্টাকে বারবার পেছনে ফেলে দিচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতাও জোরদার হয়েছে। শিকাগোর কারাগারের ভেতরে সিনথেটিক মাদক খুঁজতে প্রতিটি কাগজের টুকরো পর্যন্ত তল্লাশি করা হচ্ছে — এমন চিত্রও সামনে এসেছে। অর্থাৎ মাদক এখন শুধু রাস্তার সমস্যা নয়; বদ্ধ প্রতিষ্ঠানের ভেতরেও তা ঢুকে পড়ার ঝুঁকি কর্মকর্তাদের ভাবিয়ে তুলছে।
বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যায়, সিনথেটিক মাদকের সবচেয়ে বড় বিপদ এর অনিশ্চয়তা। কোন চালানে কী উপাদান, কতটা মাত্রায় মেশানো আছে, তা সেবনকারী জানেন না। ফলে একই নামে বিক্রি হওয়া মাদক একেকবার একেক মাত্রার প্রভাব ফেলে, আর অতিরিক্ত সেবনে মৃত্যুর ঝুঁকি হঠাৎ বেড়ে যায়। সস্তা হওয়ায় তরুণ ও অর্থকষ্টে থাকা মানুষের কাছে এগুলো দ্রুত পৌঁছে যাচ্ছে বলেও উদ্বেগ রয়েছে।
দেশটির মাদক সংকটের ইতিহাস দীর্ঘ। দশকের পর দশক ধরে নানা ধরনের মাদকের ঢেউ এসেছে যুক্তরাষ্ট্রে, প্রতিবারই মৃত্যু আর সামাজিক ক্ষতির বোঝা বেড়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মৃত্যুর সংখ্যা কমে আসা কিছুটা অগ্রগতি হিসেবে দেখা হলেও কর্মকর্তারা বলছেন, সিনথেটিক মাদকের নতুন প্রজন্ম সেই অগ্রগতি উল্টে দিতে পারে।
সাউথ সাইডের মতো এলাকাগুলোতে এই লড়াই শুধু পুলিশি অভিযানের বিষয় নয়। মাদকাসক্তি থেকে মানুষকে ফেরানো, চিকিৎসা ও সহায়তার ব্যবস্থা পৌঁছে দেওয়া এবং এলাকার তরুণদের এই পথ থেকে দূরে রাখা — সব মিলিয়েই সম্প্রদায়গুলোর প্রতিদিনের সংগ্রাম। বিবিসির প্রতিবেদনে সেই মাটির কাছের লড়াইয়ের ছবিই ফুটে উঠেছে।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বোঝা যায় কর্মকর্তাদের ভাষায়। অতিরিক্ত সেবনে মৃত্যু কমলেও তারা একে বিজয় হিসেবে দেখছেন না; বরং সস্তা ও শক্তিশালী সিনথেটিক মাদকের সরবরাহ বাড়তে থাকায় সামনের দিনগুলোতে সংকট আবার তীব্র হতে পারে বলে তারা আগে থেকেই সতর্ক করছেন।
সব মিলিয়ে শিকাগোর সাউথ সাইড থেকে পাওয়া চিত্রটি পুরো যুক্তরাষ্ট্রের জন্যই সতর্কবার্তা। সংখ্যায় উন্নতি আর মাটির বাস্তবতার মধ্যে ফারাক থেকেই যাচ্ছে। নতুন সিনথেটিক মাদকের এই ঢেউ ঠেকাতে সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সম্প্রদায়ভিত্তিক লড়াই কতটা সফল হয়, সেদিকেই এখন নজর থাকবে সবার।




