সিভিতে মিথ্যা তথ্য দিয়ে ডব্লিউএইচওর পদ পাওয়ার অভিযোগে সায়মা ওয়াজেদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্রের অনুমোদন দুদকের
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালক পদে নিয়োগ পেতে জীবনবৃত্তান্তে (সিভি) মিথ্যা তথ্য দেওয়ার অভিযোগে সায়মা ওয়াজেদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিলের অনুমোদন দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সায়মা ওয়াজেদ ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মেয়ে।
দুদক সচিব মো. সাইদুর রহমান খান রোববার এক ব্রিফিংয়ে সায়মা ওয়াজেদের বিরুদ্ধে চার্জশিট অনুমোদন দেওয়ার তথ্য জানান। এর ফলে মামলাটি এখন আদালতে বিচারপ্রক্রিয়ার দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি হলো।
দুদকের অভিযোগ, ডব্লিউএইচওর ওই পদে নিয়োগ পেতে জমা দেওয়া সিভিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বর্তমানে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়) ‘অনারারি স্পেশালিস্ট/এক্সপার্ট’ হিসেবে কাজ করার মিথ্যা ও বানোয়াট তথ্য দেন সায়মা ওয়াজেদ। ওই তথ্য ব্যবহার করেই তিনি সংস্থাটির আঞ্চলিক পরিচালক পদে নিয়োগ পান বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।
দুদকের এজাহারে বলা হয়, সায়মা ওয়াজেদ ২০২৩ সালে ডব্লিউএইচওতে আবেদনের সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা, শিক্ষা ম্যানুয়েল তৈরি বা পর্যালোচনাসংক্রান্ত কাজে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা থাকার দাবি করেন। অথচ তিনি এসব কার্যক্রমে অংশ নেননি বলেই অভিযোগ করেছে দুদক।
এজাহারে আরও বলা হয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের মাধ্যমে ২০১৭ সালে অটিজম ও স্নায়ুবিকাশজনিত সমস্যাবিষয়ক জাতীয় উপদেষ্টা কমিটির চেয়ারপারসন নিযুক্ত হন সায়মা ওয়াজেদ। ওই দায়িত্বে থাকাকালে তিনি সিভিতে নিজের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে এসব তথ্য উল্লেখ করেন। দুদকের অভিযোগ, মিথ্যা তথ্য দিয়ে এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে তিনি ডব্লিউএইচওর আঞ্চলিক পরিচালক পদে নিয়োগ লাভ করেন।
দুদকের তদন্তে বলা হয়েছে, সিভিতে দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নিয়োগপ্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে চাপ প্রয়োগ করা হয়। পরে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশন, জাতিসংঘের কার্যালয় ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় ডব্লিউএইচওর সদর দপ্তরে এসব তথ্য পাঠানো হয়। দুদকের অভিযোগ, এর পরিপ্রেক্ষিতেই ওই পদে নিয়োগ পান সায়মা ওয়াজেদ।
দুদকের অভিযোগ অনুযায়ী, সিভিতে মিথ্যা তথ্য দেওয়া এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে রাষ্ট্রের সুনাম ক্ষুণ্ন করেছেন সায়মা ওয়াজেদ। অর্থাৎ অভিযোগটি শুধু ব্যক্তিগত অনিয়মের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার প্রশ্নও তোলা হয়েছে।
এ ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪২০, ৪৬৮ ও ৪৭১ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে। এসব ধারায় মিথ্যা তথ্য, জালিয়াতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারসংক্রান্ত অভিযোগের বিচার হবে।
এটি সায়মা ওয়াজেদের বিরুদ্ধে দুদকের প্রথম পদক্ষেপ নয়। এর আগে ২০২৫ সালের ২০ মার্চ মিথ্যা তথ্য দিয়ে ডব্লিউএইচওতে চাকরি নেওয়া এবং সূচনা ফাউন্ডেশনের নামে চাপ প্রয়োগ করে ২০টি ব্যাংক থেকে ৩৩ কোটি টাকা আদায়ের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলা করে দুদক।
সেই মামলাগুলোর তদন্তের ধারাবাহিকতাতেই এবার সিভিতে মিথ্যা তথ্যের অভিযোগে চার্জশিট দাখিলের অনুমোদন এল। তদন্ত পর্যায় শেষে অভিযোগপত্র অনুমোদন পাওয়ায় মামলাটি এখন পরবর্তী আইনি ধাপে প্রবেশ করছে।
বিষয়টির গুরুত্ব এই কারণে বেশি যে, অভিযোগটি আন্তর্জাতিক একটি সংস্থার শীর্ষ পর্যায়ের একটি পদে নিয়োগপ্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে। ডব্লিউএইচওর আঞ্চলিক পরিচালকের মতো পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে দেওয়া তথ্যের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় ঘটনাটি দেশের ভেতরে ও বাইরে মনোযোগ কেড়েছে।
এখন চার্জশিট আদালতে দাখিলের পালা। আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণ করলে বিচারপ্রক্রিয়ার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে এবং সেখানেই অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই হবে।
সব মিলিয়ে দুদকের এই সিদ্ধান্ত সায়মা ওয়াজেদকে ঘিরে চলমান আইনি প্রক্রিয়ায় নতুন মাত্রা যোগ করল। মামলার পরবর্তী অগ্রগতি এবং আদালতের সিদ্ধান্তের দিকেই এখন সবার নজর থাকবে।



