দুর্গাপূজার নিরাপত্তায় উত্তরের তিন জেলায় ২৩ প্লাটুন বিজিবি, নজরদারিতে ১৫১ মণ্ডপ
শারদীয় দুর্গাপূজা ঘিরে উত্তরের তিন জেলা ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় ও নীলফামারীতে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। সীমান্তবর্তী এলাকার ১৩৫টি পূজামণ্ডপে বাহিনীটি নিবিড় নিরাপত্তা দিচ্ছে। এর পাশাপাশি তিন জেলার শহরাঞ্চলের আরও ১৬টি পূজামণ্ডপের নিরাপত্তার দায়িত্বও পালন করছে বিজিবি। সব মিলিয়ে ১৫১টি মণ্ডপের নিরাপত্তায় মোতায়েন করা হয়েছে ২৩ প্লাটুন বিজিবি সদস্য।
রোববার বিকেলে পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার কাজলদিঘী কালিয়াগঞ্জ ইউনিয়নের কালীতলা এলাকায় দুর্গাপূজার মন্দির পরিদর্শন শেষে এক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান ঠাকুরগাঁও সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মোহাম্মদ সুরুজ মিয়া। পরিদর্শনের সময় তিনি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন এবং তাদের হাতে শুভেচ্ছা উপহার তুলে দেন।
কর্নেল মোহাম্মদ সুরুজ মিয়া বলেন, দুর্গাপূজা দেশের ঐতিহ্যবাহী একটি অনুষ্ঠান এবং হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে এই উৎসবের মধ্য দিয়ে হিন্দু-মুসলমানের ভ্রাতৃত্ববোধের বহিঃপ্রকাশ ঘটে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষায়, যুগ যুগ ধরে দেশে এই ঐতিহ্য চলে আসছে, আর দুর্গাপূজা উপলক্ষে বিজিবি সর্বাত্মক নিরাপত্তার আয়োজন করেছে এবং সে অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছে।
সীমান্তের আট কিলোমিটারের মধ্যে থাকা পূজামণ্ডপগুলোর নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছে বিজিবি। সেক্টর কমান্ডার জানান, আনসারসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা হচ্ছে। এ ছাড়া জেলাভিত্তিক বিজিবির ব্যাটালিয়নগুলোও নিজ নিজ এলাকায় দায়িত্ব পালন করছে, যাতে প্রতিটি মণ্ডপ নিরাপত্তা বলয়ের আওতায় থাকে।
নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কে তিনি বলেন, সমন্বিত উদ্যোগের অংশ হিসেবে নিয়মিত টহল দেওয়া হচ্ছে, গোয়েন্দা নজরদারি চলছে এবং পূজামণ্ডপ কমিটির সদস্যদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে দায়িত্ব পালন করা হচ্ছে, যাতে কোথাও কোনো অপ্রীতিকর বা অস্বাভাবিক ঘটনা না ঘটে।
পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য একটি মনিটরিং সেলও কাজ করছে বলে জানান তিনি। সেখানে নিয়মিত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। যোগাযোগের জন্য নম্বর দেওয়া আছে। পাশাপাশি সুরক্ষা অ্যাপের মাধ্যমেও আনসার সদস্যদের কাছ থেকে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। দায়িত্বে থাকা সদস্যরা কোথাও অস্বাভাবিক কিছু ঘটলে বা নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে সে বিষয়ে তথ্য পাচ্ছেন।
গুজব ও ভুল তথ্য ছড়ানোর বিষয়ে সতর্ক করে কর্নেল মোহাম্মদ সুরুজ মিয়া বলেন, খুব সতর্কতার সঙ্গে একটি বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে—কোনো গুজব, ভুল তথ্য বা মিসইনফরমেশনের সুযোগ নিয়ে কেউ যেন অস্বাভাবিক কিছু প্রচার করতে না পারে। এ বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকার আহ্বান জানান তিনি।
সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, কোনো রকম গুজব বা ভুল তথ্য ছড়ালে তারা যেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং সহযোগিতা করেন। কেউ সত্যিকারের অপরাধ করে থাকলে তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি আশ্বস্ত করেন।
সীমান্তের ঝুঁকি প্রসঙ্গে সেক্টর কমান্ডার বলেন, সীমান্ত এলাকা সব সময়ই বিজিবির কাছে গুরুত্বপূর্ণ। এক দেশের অপরাধী অন্য দেশে পালিয়ে যেতে পারে, আবার অন্য দেশের অপরাধীরাও এ দেশে প্রবেশ করতে পারে। এ কারণে সীমান্তে শক্ত অবস্থান বজায় রাখা প্রয়োজন, যাতে কেউ নাশকতা বা অপরাধ সংঘটনের সুযোগ না পায়।
তিনি আরও জানান, সীমান্ত এলাকার রাস্তাঘাট ও যোগাযোগব্যবস্থায় কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে, ফলে অপরাধীরা সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। তবে দুর্গম এলাকাতেও বিজিবির বিওপি রয়েছে এবং সেখানে অবস্থান করেই সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। কোনো নির্দিষ্ট এলাকাকে আলাদাভাবে ঝুঁকিপূর্ণ বলা হচ্ছে না; বরং পুরো সীমান্ত এলাকাকেই গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করে সতর্কতা বজায় রাখা হচ্ছে।
পরিদর্শনের সময় কর্নেল মোহাম্মদ সুরুজ মিয়া কালীতলা এলাকার তিনটি পৃথক মন্দির ঘুরে দেখেন। এ সময় নীলফামারী ৫৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সরকার আসিফ মাহমুদসহ বিজিবির সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
পূজা চলাকালীন পুরো সময়জুড়ে এই নিরাপত্তাব্যবস্থা ও টহল অব্যাহত থাকবে বলে ব্রিফিংয়ে জানানো হয়। মণ্ডপ কমিটি, স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত নজরদারির মধ্য দিয়েই উৎসব শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যের কথা বলেন বিজিবি কর্মকর্তারা।






