বিক্ষোভে জ্বলছে ফ্রান্স, কনসার্টে মাক্রোঁ—সমালোচনার ঝড়
ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির বিরুদ্ধে দেশজুড়ে বিক্ষোভ সহিংসতায় রূপ নেওয়ার রাতে সেলিন ডিওনের কনসার্টে উপস্থিত থাকায় তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁ।
ফরাসি সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, শুক্রবার রাতে প্যারিসের পশ্চিমে নঁতেরের প্লেনিটিউড অ্যারেনায় ডিওনের কনসার্টে মাক্রোঁ ও তাঁর স্ত্রী ব্রিজিত উপস্থিত ছিলেন। প্রায় ৩৫ হাজার দর্শকের মধ্যে তাঁরা অনেকটা নীরবেই আসেন ও চলে যান বলে জানা গেছে।
অথচ তার ঠিক আগেই বৃহস্পতি ও শুক্রবার ব্রাসেলসে ইউরোপীয় কাউন্সিলের বৈঠকে ছিলেন মাক্রোঁ। সেখানে শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি শনিবারের পরিকল্পিত বিক্ষোভের আগে ‘শান্তি ও সম্মান’ বজায় রাখার আহ্বান জানান এবং বলেন, বিক্ষোভের অধিকার প্রয়োগ করতে হবে মানুষ ও সম্পত্তির প্রতি সম্মান রেখে।
কিন্তু শনিবার সেই বিক্ষোভই বদলে যায় ব্যাপক সহিংসতায়। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, বিদ্যালয়ের পরিস্থিতি ও জনসেবার অবনতির প্রতিবাদে শুরু হওয়া কর্মসূচি দেশের নানা শহরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট এবং সরকারি ভবনে হামলায় রূপ নেয়।
ফরাসি কর্তৃপক্ষ রোববার জানিয়েছে, সারাদেশে প্রায় ১ হাজার ৮০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যার মধ্যে প্যারিস অঞ্চলেই ৮৫৫ জন। অভ্যন্তরীণ মন্ত্রী লরঁ নুনিয়েজের তথ্য অনুযায়ী, পুলিশ, জেন্ডার্মি ও দমকল বাহিনীর ৫০০ জনের বেশি সদস্য আহত হয়েছেন। প্যারিসে বিক্ষোভ চলাকালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে এক বিক্ষোভকারী মারা গেছেন বলেও কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
মধ্য ফ্রান্সের লিমোজে উদ্দেশ্যমূলকভাবে সিটি হলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়, এতে ঐতিহাসিক ভবনটির ব্যাপক ক্ষতি হয়। প্যারিস, বোর্দো, মার্সেই, লিওঁসহ বিভিন্ন শহরে দোকানপাট লুট হয় এবং সরকারি ভবনে ভাঙচুর ও আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে।
কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, সারাদেশে ৫ লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। আয়োজকদের দাবি, এই সংখ্যা প্রায় ৮ লাখ।
মাক্রোঁ শনিবার সন্ধ্যায় সামাজিক মাধ্যমে ধ্বংসযজ্ঞের নিন্দা জানান। তিনি লেখেন, সম্পত্তি ধ্বংস, সরকারি ভবনে হামলা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান লুটের দায়ে জড়িতদের বিচার ও শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি সমর্থন জানিয়ে তিনি ফরাসি প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করার চেষ্টার বিরুদ্ধেও সতর্ক করেন।
কিন্তু তাঁর এই বিবৃতি আসে সহিংসতা বহু বড় শহরে ছড়িয়ে পড়ার পরে। ফলে সরকারের প্রস্তুতি এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে—আর কনসার্টে উপস্থিতির বিষয়টি সেই সমালোচনাকে আরও উসকে দিয়েছে।
এই অস্থিরতার শুরুটা ছিল ভিন্ন। শ্রমজীবী অধ্যুষিত শহরতলিগুলোতে বিদ্যালয়ের পরিস্থিতি ও শিক্ষক সংকট নিয়ে এক মাস ধরে চলা ছাত্র আন্দোলন থেকে এর সূত্রপাত। পরে তা বৈষম্য, সরকারি ব্যয় সংকোচন ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির বিরুদ্ধে বড় আন্দোলনে রূপ নেয়।
প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু এই সহিংসতার জন্য ‘অতিবাম’ গোষ্ঠী ও অপরাধীদের দায়ী করেছেন। অন্যদিকে বিরোধী নেতারা সরকারের নীতিকেই দোষারোপ করছেন।
ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার আর ক্ষয়ক্ষতির হিসাবের মধ্য দিয়ে ফ্রান্স এখন শান্তি ফেরানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু মাক্রোঁর কনসার্ট-উপস্থিতি নিয়ে বিতর্ক দেখিয়ে দিচ্ছে, এই সংকটে সরকারের প্রতিটি পদক্ষেপই এখন জনমতের কড়া নজরদারিতে থাকবে।




