কলঙ্কের পাহাড় পেরিয়ে টেক্সাসের সিনেট আসন জিততে পারবেন কি কেন প্যাক্সটন
টেক্সাসের অ্যাটর্নি জেনারেল ও মার্কিন সিনেটের রিপাবলিকান প্রার্থী কেন প্যাক্সটনের অবস্থানকে দুইভাবে দেখা যায়—কেউ বলবেন জনমত জরিপে তার লড়াইটা প্রত্যাশিত, কেউ বলবেন এত বিতর্কের পরও তিনি যে আরও পিছিয়ে পড়েননি, সেটাই বিস্ময়কর। কট্টর মাগা ভোটারদের কাছে প্রিয় হলেও বৃহত্তর ভোটারদের কাছে তিনি সন্দেহের চোখে দেখা এক প্রার্থী।
সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সমর্থকদের এক সমাবেশে ৬৩ বছর বয়সী প্যাক্সটন সম্পর্কে বলেছেন, তিনি হয়তো ঠিকমতো পোশাক পরেন না, ঠিকমতো কথা বলেন না এবং তার দেখা সবচেয়ে সুদর্শন ব্যক্তিও নন—আর সেই বক্তব্য দিয়েই তিনি প্যাক্সটনকে সমর্থন জানিয়েছেন। অর্থাৎ ট্রাম্পের আনুষ্ঠানিক সমর্থন তার সঙ্গেই রয়েছে।
প্যাক্সটনের বিশেষত্ব হলো কলঙ্ক টেনে আনা এবং তা থেকে বেরিয়ে আসার ক্ষমতা। তিনি রাষ্ট্রীয় মামলা থেকে বেঁচেছেন—সিকিউরিটিজ-সংক্রান্ত অভিযোগে দোষ স্বীকার না করেই নিষ্পত্তি হয়েছে; রিপাবলিকান-নেতৃত্বাধীন টেক্সাস আইনসভার অভিশংসন থেকেও তিনি শেষ পর্যন্ত খালাস পেয়েছেন, যেখানে অভিযোগ ছিল ক্ষমতার অপব্যবহারের।
বিতর্কের তালিকা দীর্ঘ। ২০১১ সালে ম্যাকিনির একটি ডেইরি কুইনে এক প্রযুক্তি উদ্যোক্তা দাবি করেন, ঈশ্বর তাকে প্যাক্সটনকে কোম্পানির এক লাখ শেয়ার দিতে বলেছেন—উদ্যোক্তা এটিকে উপহার বললেও সমালোচকেরা বলেছেন অবৈধ কমিশন; প্যাক্সটন ও উদ্যোক্তা সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ২০১৩ সালে এক সহকর্মী আইনজীবীর এক হাজার ডলারের মঁব্লাঁ কলম চুরির অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে; প্যাক্সটন বলেন, আদালতের নিরাপত্তা তল্লাশির সময় ভুলবশত তা তার কাছে চলে গিয়েছিল।
২০২০ সালে তার নিজের আটজন কর্মী এফবিআইকে তদন্তের অনুরোধ করেন—অভিযোগ ছিল, অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে তিনি এক রিয়েল এস্টেট বিনিয়োগকারী ও রাজনৈতিক দাতাকে সাহায্য করতে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন, বিনিময়ে পেয়েছেন বিনা মূল্যে রান্নাঘর সংস্কার ও পরকীয়া সম্পর্কে থাকা এক নারীর জন্য চাকরি। প্যাক্সটন ও বিনিয়োগকারী অভিযোগ অস্বীকার করেন, বিনিয়োগকারীর বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ আনা হয়নি এবং অভিশংসন শেষ হয় প্যাক্সটনের খালাসে।
২০২২ সালে তার স্ত্রী, রাজ্য সিনেটর অ্যাঞ্জেলা প্যাক্সটন, তাকে একটি শেভ্রোলে ট্রাকে করে ফেডারেল আদালতের মামলার সমন পৌঁছাতে আসা ব্যক্তির কাছ থেকে পালাতে সাহায্য করেছেন বলে অভিযোগ ওঠে; প্যাক্সটন বলেন, ওই ব্যক্তি তাকে হয়রানি করছিলেন। গত বছর অ্যাঞ্জেলা বাইবেলভিত্তিক কারণ দেখিয়ে বিবাহবিচ্ছেদের মামলা করায় সেই অধ্যায়ের ইতি ঘটে। প্যাক্সটনের বিরুদ্ধে দুটি বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের অভিযোগের কথাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এবারের নির্বাচনে তার প্রতিদ্বন্দ্বী ডেমোক্র্যাট রাজ্য আইনপ্রণেতা জেমস তালারিকো, বয়স ৩৭, সাবেক শিক্ষক ও অস্টিনের এক প্রগতিশীল মেইনলাইন খ্রিস্টান চার্চের সঙ্গে যুক্ত সেমিনারিয়ান। ট্রাম্প তাকে ব্যঙ্গ করে তালাফ্রিকো বলেছেন। কিন্তু জরিপে দুজন প্রায় সমানে সমান, কোনো কোনো জরিপে তালারিকো এগিয়েও আছেন।
টেক্সাস ১৯৯৪ সালের পর থেকে রাজ্যব্যাপী কোনো পদে একজন ডেমোক্র্যাটকেও নির্বাচিত করেনি—যুক্তরাষ্ট্রে যেকোনো দলের জন্য এটিই সবচেয়ে দীর্ঘ পরাজয়ের ধারা। টেক্সাস পলিটিক্স প্রজেক্টের পরিচালক, রাজনৈতিক বিজ্ঞানী ও জরিপকারী জেমস হেনসন বলেন, এটি তিন দশকে রাজ্যের সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লড়াই এবং ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলো লাল সতর্ক অবস্থায় থেকে প্যাক্সটনসহ রিপাবলিকানদের বাঁচাতে লাখ লাখ ডলার ঢালছে।
এই আসনটি সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ এবং লড়াইটি ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এ ধরনের সবচেয়ে ব্যয়বহুল লড়াইগুলোর একটি। চাপের মধ্যে প্যাক্সটন বারবার তালারিকোর সঙ্গে বিতর্কের সুযোগ এড়িয়ে গেছেন, যা তালারিকো শিবিরকে তাকে ভীতু হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ দিয়েছে।
নির্বাচনের এক মাসেরও কম আগে নতুন প্রতিবেদনে ঝামেলা আরও বেড়েছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, ২০২৪ সালে দুবাইয়ে নববর্ষের আগের রাতের এক পার্টিতে প্যাক্সটনকে বিবাহবহির্ভূত বান্ধবীর সঙ্গে এবং ফেডারেল স্বাস্থ্য জালিয়াতির অভিযোগে অভিযুক্ত ও পলাতক বিবেচিত দুই ব্যক্তির সঙ্গে চিত্রিত করা হয়েছিল; তাদের একজন প্যাক্সটনকে এক লাখ ৯০ হাজার ডলার দান করেছিলেন। তার প্রচার শিবিরের মুখপাত্র পত্রিকাটিকে বলেন, ট্রাম্পের মতো প্যাক্সটনও বছরের পর বছর রাজনৈতিক নির্যাতনের শিকার এবং প্রতিবারই ভোটাররা তা বুঝে তাকে আবার দায়িত্বে ফিরিয়েছেন।
গত কয়েক সপ্তাহে অজ্ঞাত সূত্রের ফাঁস করা অডিও ক্লিপেও প্যাক্সটনকে রক্ষণশীল মিত্রদের সঙ্গে বন্ধ ঘরের আলোচনায় স্বীকার করতে শোনা গেছে যে তিনি ও টেক্সাসের অন্য রিপাবলিকানরা লড়াইয়ে আছেন। এক ক্লিপে ইরান যুদ্ধে বেড়ে যাওয়া জ্বালানি খরচ নিয়ে ভোটারদের ক্ষোভের প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের টেক্সাস মধ্যবর্তী সম্মেলন সাহায্যের বদলে ক্ষতি করেছে বলে তার মন্তব্য শোনা যায়; আরেক ক্লিপে তিনি বলেন, কোনো নির্বাচনে প্রচারের ওপর এত কম নিয়ন্ত্রণ তিনি কখনো অনুভব করেননি, সবকিছুই আসছে ওয়াশিংটন থেকে। হিউস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক বিজ্ঞানী ব্র্যান্ডন রটিংহাউস বলেন, এটি প্যাক্সটনের জন্য খারাপ চেহারা তৈরি করে এবং তাকে অকৃতজ্ঞ দেখায়; ট্রাম্প ছাড়া প্যাক্সটনের অস্তিত্বই থাকত না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে প্যাক্সটন পেনসিলভানিয়া, মিশিগান, উইসকনসিন ও জর্জিয়ার বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন—অভিযোগ ছিল, ভোটের অনিয়মে ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ট্রাম্পের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। মামলাটিতে প্রমাণের ঘাটতি ছিল এবং দুই পক্ষের সমালোচকেরাই এটিকে রাজনৈতিক স্টান্ট বলেছেন। চলতি বছরের শুরুতে ট্রাম্প সেই আনুগত্যের প্রতিদান দেন—২০০২ সাল থেকে সিনেটর থাকা জন কর্নিনের বদলে প্যাক্সটনকে সমর্থন দিয়ে, যাকে দলীয় প্রাইমারিতে হারিয়ে প্যাক্সটন মনোনয়ন পেয়েছেন।
আইনের চোখে অবশ্য প্যাক্সটনের অবস্থান পরিষ্কার বলে মন্তব্য করেছেন রাজ্যের সিকিউরিটিজ মামলার প্রসিকিউটর জেড সিলভারম্যান—তিনি চুক্তি অনুযায়ী যা করার তা করেছেন এবং মামলাগুলো নিষ্পত্তি হয়েছে। রটিংহাউস প্যাক্সটনের ক্যারিয়ারকে কলঙ্ক-সহনশীলতার পাঠ্যপুস্তকের উদাহরণ বলেছেন; মেরুকরণের কারণে কলঙ্কের ভাঙন-বিন্দুর মানদণ্ড বেড়ে গেছে বলে তিনি মনে করেন। টেক্সাসের পরামর্শক ও লবিস্ট বিল মিলারও বলেন, আমেরিকান জনগণ যেন ব্যাগেজ মেনে নিতে শিখেছে—মানুষ নিষ্কলঙ্ক আশা করলেও শেষ পর্যন্ত তেমন প্রার্থীকেই ভোট দেয়, যেমন আছে। সামনে এখন প্রশ্ন একটাই—ভোটের দিন এই সহনশীলতাই প্যাক্সটনকে আবার বাঁচিয়ে দেবে, নাকি এবার হিসাব বদলাবে।




